Posts Tagged ‘nakshal’

ও নিজেই গল্প করে ব্যাবসা চলছে মোটামুটি ভালই, আস্তে আস্তে মার্কেট বাড়ছে, লোকে চিনছে ওর প্রোডাক্ট, ভালো ভালো কমিশন রাখছে সেলারদের জন্যে। শুরু থেকে মানুষ কিছুই শিখে আসে না, তাকে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে জানতে হয়, বুঝতে হয় সব কিছু, তখন পদে পদে তাকে গাইড করার জন্যে লোক থাকে, কখনও বাবা মা, কখনও অন্য বড়রা। আগে একান্নবর্তী পরিবারের যুগে বাচ্চারা খুব ছোটবেলা থেকে কথা বলতে শিখে যেত, এখন ঘর ছোট হয়েছে, বাগান শেষ হয়েছে, বাবা মায়ের ব্যাস্ততার মাঝে অবসর কম, বাচ্চারা শিশু থেকে হটাত বালক হয়, তারপর হটাত করেই একদিন কেমন বড় হয়ে যায়।

কি করছিস ভাই ছাদে দাঁড়িয়ে, তারা গুনছিস নাকি? মস্করা করলো নন্তু। নন্তু অবশ্য এইদশাটা জানে অর্কর। অর্কর এরকম স্বভাব আছে, মাঝে মাঝেই নিজেতে হারিয়ে যায়, কোন অদ্ভুত কিছু নিয়ে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পরে।

নন্তু এক কথা বল, ছোটবেলায় যখন পরীক্ষার খাতা বের হতো বাড়িতে দেখানোর জন্যে, কেমন লাগত তখন?

নন্তু ঘুরল, তাকাল আকাশের দিকে, তারপরে আস্তে করে বলল, ঠিক ওই আকাশের মত, মনে হত খারাপ পরীক্ষা দিয়েছি তো জানতামই, শুধু শুধু বাবা-মা’র কাছে বেইজ্জত করার কি দরকার বাপু!

অর্ক হেসে ফেলল, নন্তু কোন কালেই ভালো নাম্বার পাওয়াদের দলে ছিল না, ওর বাড়ি থেকেও সেরকম কোনও চাপ ছিল না, খারাপ নাম্বার পাওয়ার পরে ওর বাবা-মা কে কখনো মুখ লুকোনোর দরকার পড়েনি, যেমনটা ওর বাড়িতে হতো, খারাপ নাম্বারের থেকেও বড় ছিল পাড়াতেই অন্য আরেকটি মেধাবী ছেলের বেশি নাম্বার পাওয়া, অর্ক চেষ্টা করতো না, তা নয়, কিন্তু সেই ছেলেটা আরও বেশি চেষ্টা করতো, আরও বেশি নাম্বার পেত, ফল হতো এইযে বাবা অফিস থেকে ফেরার পরে কখনও খুব করে ঝাড় পড়তো, কখনও মন খারাপ করে মা একবেলা খাওয়া ছেড়ে দিতেন। এই ফ্রাস্তেসানটা কখনও যায়নি অর্কর। একসাথে বিকেলে খেলতে যাওয়া, তারপরে আবার পরের দিন সকালে এক থালা ভাত খেয়ে স্কুলে যাওয়ার মধ্যেও কোথাও একটা সেই হীনমন্যতা কাজ করতো সারাক্ষণ। মনে হতো বাবা মা এতো কষ্ট করে বড় করছেন, কিন্তু সে তার কোনও প্রতিদান দিতে পারছে না, চেষ্টা করেও। নন্তুর সেইসব চাপ ছিল না, খাতা বেরোনোর পরেও বিন্দাস বিকেলেবেলা ডাকতে চলে আসতো খেলার মাঠে যাওয়ার জন্যে।

এখন বেসরকারি অফিসে চাকরি করা, হাজারটা ঝামেলা, যন্ত্রণা, মীটিং, কর্পোরেট পলিটিক্সের মাঝে যে দুদণ্ড সময় নিজের জন্যে বাঁচে, সেই সময় ভাবতে ইচ্ছে করে, ছোটবেলাটা তার খারাপ ছিল না, বেশ আনন্দেরই ছিল, শুধু ওই প্রতিযোগিতার গরম নিশ্বাসটা এখনও মাঝে মাঝে রাতের ঘুম নিয়ে খেলা করে, খারাপ নাম্বার পাওয়াটা ততটা দুঃখ দেয় না, যতটা দেয় সেইসময়ের মানসিক যন্ত্রণাটা। আজ আপাতসফল জীবনের মাঝেও সেইদিনের ক্ষতগুলো ভুলতে পারে না সে, ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকলে, সে শুধু পড়াশুনা করতো, কোনও প্রতিযোগিতায় না জিতে, জেতার চেষ্টাও না করে।

অকল্যান্ড সাহেবের বাংলোর সামনে যখন এলো সে, দেখতে পেল ভেতরে সাহেব একটা হাফ প্যান্ট পরে বসে আছেন চেয়ারে গা এলিয়ে। বিতান অবশ্য একা যায়নি। মনোহরদা’ও ছিলেন ওর সাথে। মনোহরদা কি করতে গিয়েছিল, সেটা অবশ্য ও জানত না, জানার দরকারও ছিল না। ও শুধু গেছিলো মনোহরদা ডাকলেন বলে আর সাহেবের ঘরে একটু উঁকি মারতে। ও জানে যে ওরা খুব গরিব, বড়লোকের বাড়িতে একটু ভালমন্দ খেতে পেলে কি ক্ষতি?

সাহেব ওদের বসতে বললেন। একটু পরে একজন বেয়ারা এসে দুকাপ চা রেখে গেলো। মনোহর দা ওকে বললেন একটু দূরে সরে যেতে, আলাদা ভাবে কথা বলতে চান সাহেবের সাথে, সে আপত্তি করল না। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে বেরিয়ে এলো মনোহর দা, মুখে হাসি নিয়ে। গেটের বাইরে বেরিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে বললেন, “কাজটা হয়ে এলো রে, আরেকটা দিন লাগবে, তারপরে সামনের পঞ্চায়েত ভোটে আমাকে হারায় কে? শোন বিতান, তোকে একটা কাজ করতে হবে, গ্রামে ঢুকবি একটু ঘুরপথ দিয়ে, আমি অন্য রাস্তা দিয়ে যাবো। কাল সক্কাল সক্কাল বেশ কিছু ছেলেপুলে নিয়ে চলে যাবি জমির পাশে, আর শ্লোগান দিতে হবে। বাকি কাজ আমি কাল সকালেই বলে বুঝিয়ে দেবো। যা এখন ভাগ। বিতান দাঁত বের করে একটু হাসল, মনোহরদা ওর হাতে একটা বিড়ি দিলেন, তারপরে মোড়ের মাথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

উত্তরদিকে একটা বড় জামগাছ আছে, সেখানে এইসময়ে জাম পাওয়া যায়। বিতান একবার এদিক ওদিক দেখে নিলো, কাল সকালে যা করার, সেটা হল কিছু ওর মতই বিচ্ছু ছেলে জুটিয়ে সকালে চলে যেতে হবে ওই জমির কাছে আর চিৎকার করতে হবে যে গ্রামের জমি ছাড়বো না, পুঁজিবাদীর কালোহাত ভেঙ্গে দাও, গুড়িয়ে দাও, তারপরে মনোহরদা যাবেন ওদের তরফে কথা বলতে অকল্যান্ড সাহেবের সাথে, কিছু শর্ত দেবে আর অকল্যান্ড সাহেব সেটা মানবেন না, আবার সবাই চিৎকার করবে, তারপরে অকল্যান্ড সাহেব মেনে নেবেন অল্প কিছু দাবি র মনোহরদা আকর্ণ হাসি হেসে দেশ জয়ের কাজ সমাধা করবেন। এটা ও অনেকদিন ধরেই জানে। এর আগে একবার ইলেকট্রিক আসার কথা হয়েছিল সরকারের তরফে, সেখানেও এভাবেই কথা বলে কায়দা করে হিরো হয়ে গেছিলো মনোহরদা। সামনের ভোটে দাঁড়াবে এইবার, এখন থেকেই তার জমি তৈরি করছে। গ্রামের লোকও বোকা, ওই বাঁজা জমিতে চাষ আবাদ কিছুই হয় না, ফি বছর একবার করে মাটি খুঁড়ে পুকুর বানানোর খেলা করা হয়, সেখানে কারখানা হলে ক্ষতি কি, কেউ জানে না। পাবলিক বহুত বোকা, যে যেমন খাওয়ায়, সে তেমনই খায় আর এখান থেকেই বিতানকেও করে খেতে হবে। দাদার সঙ্গে জোত দেওয়ার কাজ তার পোষাবে না একেবারে। ভাবতে ভাবতে জামগাছের নিচে পৌঁছে গেলো সে, আর কপাল ভালো, হাতের কাছেই বেশ কটা পাকা পাকা জাম পেয়ে গেলো। কটা বউদির জন্যে পকেটে পুরে নিলো। ওর বউদিটা কেমন একটা হয়ে গেছে, তবে কেউ কিছু এনে দিলে বড় খুশি হয়। বাকি জামগুলো খেতে খেতে তাঁতিপাড়ার রাস্তা টা ধরল। এই রাস্তায় সন্ধ্যের পরে কেউ খুব একটা বেরোয় না।

সকালে যেমনটা ভাবা হয়েছিল, তেমনটাই হল, মজা দেখতে না ভয়ের জন্যে বেশ ভালোই ভিড় হয়েছিল। অকল্যান্ড সাহেব হাত পা নেড়ে অনেক কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন আর এদিকে মনোহরদা কিছুই শুনবেন না! শেষে অকল্যান্ড সাহেব অর্ধেকের বেশি কথা মেনে নিলেন, কথা দিলেন বাইরে থেকে নয়, বেশীরভাগ শ্রমিকই গ্রাম থেকে নেওয়া হবে, বটতলার মন্দির টা তৈরি করে দেওয়া হবে পাকা করে, রাস্তা গ্রামের মধ্যিখান দিয়ে নয়, পাশ দিয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। দুপুরে এলো প্যাকেট করা বিরিয়ানি আর বিকেলে এলো প্যাকেট করা মাল,মাল মানে চোলাই। বেড়ে নেশা হয়। দু’প্যাকেট টানার পর সত্যি মালুম হয় কেন বলা হয় রাজনীতি হল রাজার নীতি!

ঘুমটা সবে চোখে লেগেছে, আর সেই সময়েই উত্তমদা’র গলা পেলো বিতান, নিচুগলায় ডাকছিল দরজার বাইরে থেকে, উত্তমদা অন্য দলের লোক কিন্তু একই গ্রামে থাকে, ছোটবেলায় একসাথে অনেক ফুটবল খেলেছে সে, মনোহরদা বারবার বলে দিয়েছেন অন্য লোকের ডাকে রাতের বেলা দরজা না খুলতে কিন্তু তাই বলে উত্তমকে অন্য দলের লোক ভাবতে তার ইচ্ছে করলো না। একা উত্তমই দাঁড়িয়ে ছিল, বারবার পিছনে ফিরে দেখছিল আর কেমন একটা কাপছিল ও, তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকিয়ে নিলো বিতান, তারপরে দরজা টা বন্ধ করে হুড়কো টেনে দিলো।

চলবে…

মালতী টুডু’র তাতে কিছু আসে যায় না। তার বয়েস হল চার কুড়ি। মিশকালো হাতে মোটা দড়ির মত শিরা উপশিরা আর রুক্ষ জমি যেমন ফুটিফাটা হয়ে থাকে, তেমন পা নিয়ে সে এই বয়সেও দৌড়ে বেড়ায় এই বাড়ি থেকে ওই বাড়ি। সে এই গ্রামের ডাক্তার। এখানে শহরের মত ডাক্তার দোকান খুলে বসে না, শহুরে ওষুধও বিক্রি হয় না, আসলে এসে পৌছায়ই না কিছু। মালতীবুড়ী নিজেই পশ্চিমদিকের জঙ্গল থেকে নানান গাছ গাছড়া নিয়ে নিজের বারান্দায় খালি গায়ে বসে বেটে অসুধ বানায়। উড়শ গাছের অসুধ দিয়ে ভাল ব্যাথার অসুধ তৈরি হয়, পেট খারাপ হলে গ্যাদাল পাতার রস খালি পেটে সকাল বেলা। মালতীর তিন কুলে কেউ নেই। ওর কখনও বিয়ে হয়েছিল কিনা কেউ জানে না। ওর বয়সের কেউ আর বেঁচে নেই গ্রামে। জঙ্গলের কচুসেদ্ধ, এর ওর বাড়ির লাউ কুমড়ো এইসব দিয়ে তার একবেলার খাবার হয়ে যায়। একটা ছোট ঘর আর একফালি উঠোন নিয়ে তার সংসার। তার ভোটের পরিচয়পত্র নেই বলে ভোট দিতে যেতে হয় না, তাও ওই যে অল্পসল্প ডাক্তারি করে বেড়ায়, তাই ওকে কেউ খুব একটা ঘাঁটায় না। নিতাইয়ের বউকে ওই মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসে। দেখে আসে একটা কম বয়েসি মেয়ে কীভাবে নিজের মধ্যে গুমরে গুমরে কাঁদে, তার সঙ্গেই সুখদুঃখের কথা বলে মাঝে মাঝে।

তখন কতই বা বয়েস হবে, মেরেকেটে ষোল, অকল্যান্ড সাহেব যখন গ্রামে এলেন, তখন আর পাঁচটা লোকের মত সেও গেছিল ইংরাজি সাহেবকে দেখতে। সাহেব সব দেখলেন, ইংরাজিতে কি সব জিজ্ঞাসা করলেন ওনার সঙ্গে আসা লোকজনকে, তারপর চলে গেলেন। সেদিনই বিকেলে বিতানকে যেতে হয়েছিলো সাহেবের বাড়িতে। আসলে তাদের গ্রামে একটা রাজনীতির দল আছে, তারা সব কাজেই একটু মাতব্বরি করতে চায়, কিন্তু তাদের সঙ্গে থাকলে পুলিশ কিছু বলেনা, গ্রামের লোকও একটু পাত্তা দেয়, নিজেকে বেশ একটা বড়োলোক বড়োলোক লাগে। বিতানের ভাল লাগে না ওর দাদার সঙ্গে বাড়ি তৈরির যোগাড়ের কাজ করতে। কিছুদিন গেছিলো সে, কিন্তু সে বড় খাটুনির কাজ। সকালবেলা পান্তা খেয়ে বেরোনো, সারাদিন রোদ মাথায় করে কাজ করে দুপুরের পরে বাড়ি ফিরে খেয়ে দেয়ে ঘুমনো। এটা তার কাজ নয়। সে পাঁচ ক্লাস অব্দি পরেছে, এর বেশি পড়ার জায়গা নেই তাদের গ্রামে। এর উপরে পড়তে হলে তিন ক্রোশ দূরে যেতে হয়, আক্রা নদী পেরিয়ে। আর পড়াশুনা করেই বা কি হবে? কে তাকে চাকরি দেবে? গ্রামের লোকের খাবার পয়সা নেই আর তাকে কিনা দেবে চাকরি! এমনিতে সে বেশ একটু ষণ্ডাগণ্ডা চেহারার, খাই ও বেশি। ওর দাদা সেটা নিয়েও কথা শোনাতে ছাড়ে না। বউদি ভাল, সে মাঝে মাঝে কুমড়োর ঝোলে ছোলা দেয়, আর দেয় নারকোলের টুকরো। এই রাজনীতির দলের সঙ্গে ঘুরে আজকাল তার নিজেরও একটা পরিচিতি হয়েছে, লোকে তাকে চেনে। ভোটের সময় দুপুরবেলা বিরিয়ানি খেতে দেয়, প্যাকেটে করে। বাপ রে, কি গন্ধ তার, একবার খেলেই মনে হয় ভিতরটা জুড়িয়ে গেলো, সে তো পরাণদা’রটাও অর্ধেক খেয়ে নিয়েছিলো।

চলবে…

নিতাইয়ের ভাইয়ের নাম বিতান। কোন রসিক লোক এরকম একটা গ্রামে এরকম একটা আধুনিক নাম রেখেছিল, বিতান জানে না, তার থেকে দুবছরের বড় নিতাইও জানে না। একবার গ্রামে এক সাহেব এসেছিলেন জমি কিনতে, কি না একটা কারখানা বানাবেন, তারপরে গরশলের দিকে একটা জায়গা চূড়ান্ত করার পরে চলে গেছিলেন। গ্রামের মাথারা, রাজনীতির মাতব্বরেরা বেশ ভিড় করেছিল তার কৃতিত্ব নেওয়ার জন্যে, কিন্তু কিছুদিন পরেই দেখা গেল, এরকম কিছু আর হল না, শুধু পাঁচিল তোলা থাকলো, নিতাই আর তার দলবল পাঁচিল তুলে দুটো টাকা কামালো আর তার ভাই বিতান, জোগাড় লাগিয়ে পালাল কলকাতা শহরে।

গ্রামে বেশ চর্চা হল কটা দিন, তারপরে আবার সবাই ভুলে গেছিলো, মনে পড়েছিল সেইদিন, যেদিন জল উঠল গ্রামে, সবাই আশ্রয় নিল স্কুলের চাতালে, আর সেখানে বাচ্চা জন্ম দিল নিতাইয়ের বউ। সবাই বলল, মেয়ে হয়েছে, ঘরে লক্ষ্মী এলেন। যেই সে মারা গেল সকালে, প্রাথমিক শোকের ধাক্কা সামলে  ওঠার পরে কানুজ্যাঠা বেশ গলা ভারি করে বললেন, “বাবা নিতাই, ওই পাঁচিলের কাজটা করা তোমার উচিত হয়নি। বড়ঠাকুর সেদিন জমিয়ে রেখেছিলেন, আজ জবাব দিলেন, যতই হোক, গ্রামেরই তো জমি!” বড়ঠাকুরের মন্দির বট গাছের নীচে। নিতাই বুঝল না, যারা জমি বেচে টাকা নিয়েছিল, তাদের ঘরে কিছু হল না, কিন্তু তার ঘরে কেন তার সদ্যোজাত মেয়ে মারা গেল। সে ছোট্ট শরীরটা নিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে মাটিচাপা দিয়ে এল আক্রা নদীর তীরে। আজও মাঝে মাঝে ওর বউ বসে থাকে ওইখানে। কি ভাবে আর কি বলে, সেই জানে, কেমন একটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে নালার মত পাতলা জলের দিকে আর মাঝে মাঝে চোখ মুছে তাকায় সেইখানটায়, যেখানে তার স্বামীর পাঁচিল তোলার অভিশাপ ভাল করে চোখ ফোটার আগেই চিরকালের মত চোখ বুজেছিল।

গতবার ভোটের আগে কথা হয়েছিল বড় পাকা রাস্তা হবে, সোজা যাবে সিউরি, জেলার সদর শহর। দুই তিন গাড়ী মাটিও পড়েছিল রাস্তার ধারে, তারপরে ভোট শুরু হল, যে কথা দিয়েছিল, তাকেই সবাই ভোট দিল, কিন্তু সে জেতার পরেও আর এক গাড়িও মাটি পড়লো না। এটা কোনও নতুন ঘটনা নয়, এখানে এভাবেই চলে আসছে বছরের পর বছর। এখানে আলো আসার কথা হয় সম্বৎসর, এখানে খাল কেটে ক্ষেতে জল আনার কথা হয়, এখানে কথা হয় বাচ্চাদের স্কুল তৈরি করার, কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পরেই সব ভো ভা।

চলবে

আক্রা নদীটাতে একটা সময় জল থাকতো, মেসাঞ্জরে বাঁধ দেওয়ার পর থেকে এখানে এখন আর তেমন জল থাকে না। একশ দিনের যে কাজ পাওয়া যায় সরকারি প্রকল্পে, সেই টাকা দিয়ে একটা পরিকল্পনার চেষ্টা হয়েছিলো, কিন্তু সে পরিকল্পনা ঠিকঠাক এগোনোর আগেই আবার কাজ বন্ধ হয়ে যায়।  জল ধরো, জল ভরো প্রকল্প শুরু হয়েছিলো একটা, তাতে ওই একশদিনের কাজের মধ্যে বেশ কিছু পুকুর কাটার কাজ করতে হত, গ্রামের ছেলে মেয়ে বউরা সবাই সেখানে কাজ করতো, কিন্তু সেখানে বৃষ্টির জলও বেশিদিন টেকে না, আসলে ভোট পাওয়ার রাজনীতিতে লোককে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হতো ঠিকই, কিন্তু ভূগর্ভের জলস্তর না মেলাতে পারলে জল টেকে না। এই আক্রা নদীই তাই ভরসা, ভাল্কা, সিজুয়া হয়ে রাখারির কাছে আবার ময়ূরাক্ষীর সাথে মিশেছে এই আক্রা নদী। বর্ষাকালে জল থাকে, তা দিয়েই অল্পসল্প চাষআবাদ হয় বক্রপুরে। আক্রা নদীর পাশেই একটা বটগাছ আছে, অনেক পুরনো, সেখানে রক্ষাকালীর মন্দির আছে, আর সেই মন্দির থেকে একটু দূরে, ওই নদীর চরেই আছে একটা মসজিদ। বর্ষাকালে ওই মসজিদে কখনও জল উঠে আসে, লোকেরা বলে আল্লা ওজু করার পানি পাঠিয়েছেন, রক্ষাকালীর মন্দিরে সাপ ঘুরে বেড়ায় তখন, লোকে বলে ভোলেবাবার চ্যালা। সেই মাটির রাস্তা ধরে, লালমাটির রাস্তা ধরে আরও একটু এগোনোর পরে আসে শুখাবাজার। শুখাবাজারে বেস্পতিবারে হাট বসতো একটা সময়, আজকাল জঙ্গলমহল নিয়ে চীৎকার আর সরকারী চেঁচামেচিতে সে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামের লোকেরাই দোকান খুলে বসে, আর গ্রামের লোকেরাই সেটা কেনে। আক্রানদীতে মাঝে মাঝে মাছ পাওয়া যায়, গ্রামের বুয়া, সতু রামু গরাইরা কেনে সেইসব আর বিকেল হলে ঘরে পিদিম জ্বেলে অপেক্ষা করে কখন আবার দিন হবে।

বক্রপুর গ্রামেরই একটা কোণের দিকে থাকে নিতাই টুডু আর ওর বউ। গেল বছর যখন রাতেরবেলা ময়ূরাক্ষীতে জল বাড়ল, মসজিদটা হেলে গেল একদিকে, গ্রামের বাচ্চা আর বুড়োরা মিলে ভিড় করল স্কুলের চাতালে, সেদিন ওর পোয়াতি বউটা বাচ্চা দিয়েছিল। কিন্তু সেই বাচ্চাটা সকাল বেলা অব্দি বেঁচে থেকে জল নেমে যাওয়াটা আর দেখতে পায়নি। তারপর থেকে ওর বউ কেমন একটা হয়ে গেছে। কখনও চীৎকার করে কাঁদে, কখনও আলুথালু শাড়ি পড়ে পুকুরের দিকে দৌড়ে যায়। নিতাই রাজমিস্ত্রির কাজ করে, সে কখনও মুর্শিদাবাদে কাজ করতে যায়, বা কখনও ভাল খদ্দের পেলে মায় বোম্বে অব্দি যায়। তখন ওর বউয়ের দেখাশুনা করে পাশেরই পান্তাখুড়ি। ওনার এরকম একটা নাম কে রেখেছিলো, কেউ জানে না। বক্রপুর গ্রামে জানার চেষ্টা বড়ই কম, ঘটনা ঘতে না এখানে, শুধু মাঝে মাঝে মাওবাদী না নকশাল ধরতে ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশের গাড়ী আসে, অচেনা কাউকে দেখলেই তুলে নিয়ে যায়। কখনও সে ফিরে আসে, কখনও আর কেউ ফেরে না। গ্রামও আস্তে আস্তে ভুলে যায় তার কথা।

চলবে

No resemblance with anything in real. it is completely a innocent story. please do not relate to anything or any incidence.

“সন্তোষকে চিনতাম আমি বক্রপুর স্কুলে পড়ার সময় থেকে। আমার থেকে এক ক্লাস উঁচুতে পড়তো সে, আর ওর যে ছোট ভাইটা, যেও কাল পুলিশের গুলিতে মারা গেছে, আমার ক্লাসমেট ছিল, ভগবান নাম ছিল। ওরা কেমন ছিল, সেটা না’হয় অন্য লোকের কাছেই শুনে নেবেন, তবে এটা জানিয়ে রাখি, ওরা কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না, কোনোদিন হাতে বন্দুক দূরের কথা, একতা হেঁসো নিয়েও কারও সাথে লড়াই করেনি। আজ আপনাদের খবরের কাগজে তাদেরকেই নকশাল বলে চালিয়ে দিয়ে সরকার বুক ফোলাচ্ছে। সন্তোষ, ভগবান তো মোটে দুটো লোক, এই চলছে গত দশ বছর ধরে। কখনও সিপিএম এর লোক মারছে আমাদের, কখন তৃণমূলের লোক, আমরা মরছি আর আপনাদের সরকার আনন্দ করছে, কেন্দ্রের সরকার বাহবা কুড়চ্ছে, এ যেন কৃতিত্ব নেওয়ার খেলায় মেতেছে সকলে। আমরা তো কেউ রাজা হতে চাইনি, আমরা বলিনি আমাদের সবাইকে পাকা ঘর করে দিতে হবে, এটাও বলিনি যে আমাদের সবার সরকারি চাকরি চাই! আপনি শহরের বাবু, আপনি হয়তো বুঝবেন না, না খেয়ে থাকার যন্ত্রণা, কিন্তু এটা নিশ্চয়ই বুঝবেন যে নিজের না খাওয়ার থেকেও বড় যন্ত্রণা বাচ্চাদের না খাইয়ে রাখা। আমরা কখনও খেতে পাই, কখনও পাই না, আমরা সেটাই ভালভাবে বলতে চেয়েছিলাম, সরকার ভাবল এই গরিব লোকগুলো বড় জ্বালাতন করছে, এদের খেতে দাও। একমুঠো ভাতের বদলে পুরে দিল গরম সীসার টুকরো। ভালই হল, আর তো খেতে চাইতে হবে না, তিন মাইল হেঁটে এক কলসি জল আনতে হবে না, ভাবতে হবে না শেষবার যখন ভোট দিয়েছিলাম, তখনও যে বলেছিল কারেন্ট আসবে, সেটা কেনও এখনও এল না। যান সাহেব, গ্রামটা ঘুরে আসুন আর তারপরে সরকারের অনুমতি নিয়ে লিখবেন আমরা নকশাল কিনা। যদি আমরা নকশাল হই, মিথ্যা লিখবেন না, আর যদি না হই, সরকারের পরামর্শ ছাড়া ছাপাবেন না যেন।“ একটানা লম্বা কথা বলে থামল মহেশ, গ্রামে একটা প্রাইমারী স্কুলে পড়াতো। সেই স্কুল উঠে গেছে কিছুদিন হল। অর্ককে পেয়ে উগড়ে দিলো খানিকটা মনের জ্বালা।

কাল রাতে এখানে একটা অভিযান হয়েছে, সরকারি অভিযান, আসলে মিলিটারি অভিযান। আধা সামরিক বাহিনী দিয়ে পুরো অঞ্চলটাই ঢেকে রাখা হয়েছিল কড়া নিরাপত্তায়, আর নিরাপত্তাহীনতার জন্য যারা দায়ী, তারা কখনও পরিচিত নকশাল নামে, আর কখনও অধুনা মাওবাদী নামে পরিচিত সরকারের খাতায়। ওদের দেখা যায় না, খোঁজ মেলে না জঙ্গলের পর জঙ্গল চষে ফেললেও। কখনও বড়সড় অভিযান হয়, পুরোপুরি সামরিক অভিযান, একেবারে ঠিকঠাক সুত্রের খবর মোতাবেক হানাও দেওয়া হয় কিন্তু কিভাবে যেন হাওয়ার মত মিলিয়ে যায় এই বাজে লোকগুলো। ততক্ষণে খবরের কাগজের টিকটিকিগুলো ঝামেলা শুরু করে দেয়, ওদের খবর বেচা দরকার, আর অভিযানকারী দলের দরকার একটা সাফল্য, সেটা মিথ্যে হলেই বা জানছে কে? সরকার সেই সাফল্য বুকফুলিয়ে শতমুখে বলে বেড়াবে তাদের গণ্ডাখানেক ভোটের প্রচারে, পাবলিকও খায় ভাল এইসব খবর। আর এমনিতেও কিছু গরিব লোক, যাদের জন্যে সরকারকে জনগনের করের টাকা ব্যবহার করতে হয়, তারা না থাকাই ভাল।

চলবে…