Archive for the ‘nakshal’ Category

ও নিজেই গল্প করে ব্যাবসা চলছে মোটামুটি ভালই, আস্তে আস্তে মার্কেট বাড়ছে, লোকে চিনছে ওর প্রোডাক্ট, ভালো ভালো কমিশন রাখছে সেলারদের জন্যে। শুরু থেকে মানুষ কিছুই শিখে আসে না, তাকে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে জানতে হয়, বুঝতে হয় সব কিছু, তখন পদে পদে তাকে গাইড করার জন্যে লোক থাকে, কখনও বাবা মা, কখনও অন্য বড়রা। আগে একান্নবর্তী পরিবারের যুগে বাচ্চারা খুব ছোটবেলা থেকে কথা বলতে শিখে যেত, এখন ঘর ছোট হয়েছে, বাগান শেষ হয়েছে, বাবা মায়ের ব্যাস্ততার মাঝে অবসর কম, বাচ্চারা শিশু থেকে হটাত বালক হয়, তারপর হটাত করেই একদিন কেমন বড় হয়ে যায়।

কি করছিস ভাই ছাদে দাঁড়িয়ে, তারা গুনছিস নাকি? মস্করা করলো নন্তু। নন্তু অবশ্য এইদশাটা জানে অর্কর। অর্কর এরকম স্বভাব আছে, মাঝে মাঝেই নিজেতে হারিয়ে যায়, কোন অদ্ভুত কিছু নিয়ে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পরে।

নন্তু এক কথা বল, ছোটবেলায় যখন পরীক্ষার খাতা বের হতো বাড়িতে দেখানোর জন্যে, কেমন লাগত তখন?

নন্তু ঘুরল, তাকাল আকাশের দিকে, তারপরে আস্তে করে বলল, ঠিক ওই আকাশের মত, মনে হত খারাপ পরীক্ষা দিয়েছি তো জানতামই, শুধু শুধু বাবা-মা’র কাছে বেইজ্জত করার কি দরকার বাপু!

অর্ক হেসে ফেলল, নন্তু কোন কালেই ভালো নাম্বার পাওয়াদের দলে ছিল না, ওর বাড়ি থেকেও সেরকম কোনও চাপ ছিল না, খারাপ নাম্বার পাওয়ার পরে ওর বাবা-মা কে কখনো মুখ লুকোনোর দরকার পড়েনি, যেমনটা ওর বাড়িতে হতো, খারাপ নাম্বারের থেকেও বড় ছিল পাড়াতেই অন্য আরেকটি মেধাবী ছেলের বেশি নাম্বার পাওয়া, অর্ক চেষ্টা করতো না, তা নয়, কিন্তু সেই ছেলেটা আরও বেশি চেষ্টা করতো, আরও বেশি নাম্বার পেত, ফল হতো এইযে বাবা অফিস থেকে ফেরার পরে কখনও খুব করে ঝাড় পড়তো, কখনও মন খারাপ করে মা একবেলা খাওয়া ছেড়ে দিতেন। এই ফ্রাস্তেসানটা কখনও যায়নি অর্কর। একসাথে বিকেলে খেলতে যাওয়া, তারপরে আবার পরের দিন সকালে এক থালা ভাত খেয়ে স্কুলে যাওয়ার মধ্যেও কোথাও একটা সেই হীনমন্যতা কাজ করতো সারাক্ষণ। মনে হতো বাবা মা এতো কষ্ট করে বড় করছেন, কিন্তু সে তার কোনও প্রতিদান দিতে পারছে না, চেষ্টা করেও। নন্তুর সেইসব চাপ ছিল না, খাতা বেরোনোর পরেও বিন্দাস বিকেলেবেলা ডাকতে চলে আসতো খেলার মাঠে যাওয়ার জন্যে।

এখন বেসরকারি অফিসে চাকরি করা, হাজারটা ঝামেলা, যন্ত্রণা, মীটিং, কর্পোরেট পলিটিক্সের মাঝে যে দুদণ্ড সময় নিজের জন্যে বাঁচে, সেই সময় ভাবতে ইচ্ছে করে, ছোটবেলাটা তার খারাপ ছিল না, বেশ আনন্দেরই ছিল, শুধু ওই প্রতিযোগিতার গরম নিশ্বাসটা এখনও মাঝে মাঝে রাতের ঘুম নিয়ে খেলা করে, খারাপ নাম্বার পাওয়াটা ততটা দুঃখ দেয় না, যতটা দেয় সেইসময়ের মানসিক যন্ত্রণাটা। আজ আপাতসফল জীবনের মাঝেও সেইদিনের ক্ষতগুলো ভুলতে পারে না সে, ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকলে, সে শুধু পড়াশুনা করতো, কোনও প্রতিযোগিতায় না জিতে, জেতার চেষ্টাও না করে।

Advertisements

বাড়িতে এলে অর্কর ঘুমের সময় বেড়ে যায়, কখনও দশটাতেও চেঁচিয়ে ঘুম ভাঙাতে হয় ওর আর এই কাজে অনুর জুড়ি নেই। অনু অর্কর বোন, তিন বছরের ছোট। কলকাতার ধর্মতলাতে একটা বেসরকারি অফিসে চাকরি করে আর সন্ধ্যেবেলা বানী সঙ্ঘে ফ্রি কোচিং সেন্টারে পড়ায় গরিব ছেলেপুলেদের। ছোটবেলা থেকেই অনুর সঙ্গে ওর ঠিক ভাইবোনের সম্পর্ক নয়, কেবল বকাঝকার সময় অর্ককে একটু দাদা সাজতে হয়, বাকি সময় নিজেরা বন্ধুর মতই মেশে, আর বয়েসের পার্থক্য কম হওয়ায় সুবিধে আরও বেশি। একটু বেশি বেলা পর্যন্ত ঘুমোলে অনুই আসে ধাক্কা দিয়ে তুলতে, আর তখন টেবিলের উপর এক কাপ চা রেখে যায়। অনু এখনও চা ছাড়া রান্না বান্না বিশেষ কিছু জানে না, শেখার চেষ্টাও নেই, মা অনেকবার চীৎকার চেঁচামেচি করে শেষে ছাড়ান দিয়েছেন কিছুদিনের জন্যে। আজ বেস্পতিবার, দুপুরে সুপ্রতিমের সঙ্গে দেখা করার কথা আছে, পানিহাটির ঘাটে, দুপুরবেলা। সুপ্রতিম ছোটবেলার বন্ধু, এখন সরকারি চাকরি করে। কলকাতায় আসার আগে থেকেই কথা হয়েছিলো। এমনিতে বাড়িতে আজ নিরামিশ রান্না, বাবা সক্কাল সক্কাল ভাত খেয়ে অফিসে, অনুও বেরোবে আর একটু পরেই, তারপরে সারাটা দিন বড্ড বোরিং। ঘরে থাকলে সিগারেট খাওয়া যায় না, পড়ে পড়ে ঘুমনো যায়না, খালি টিভি দেখা, কখনও কোনও বন্ধুর সময় খালি থাকলে তার সঙ্গে দেখা করা আর সন্ধ্যে হলে অনু ফেরার পরে ছাদে গিয়ে আড্ডা। আসলে সব বন্ধুরাই কেমন ব্যাস্ত হয়ে গেছে, কেউ থাকে বিদেশে, কেউ বা তারই মত অনেকদূরে, মাঝে মাঝে বাড়ি এসে জানান দিয়ে যায় বেঁচে আছি মা। খুব খারাপ লাগে কার সঙ্গে দেখা করার কথা ঠিক হয়ে যাওয়ার পরে হয়ত তার ফোন এলো আর বলল, ভাই কিছু মনে করিস না, আজ না হবে না। সে বোঝে না এই একটু মাত্র বেরোনো কেবল দেখা করার জন্যে নয়, এটা তার কাছে সিগারেট খাওয়ার চাবিকাঠি, এটা তার কাছে তার পুরনো শহরকে আরেকবার আরেকটু নতুন করে দেখার সুযোগ।

অর্ণবদাদের বাড়িটা সেই কোনকাল থেকেই লালরঙের, ওরা প্রতিবছর বাড়ির রঙ করাতো, কিন্তু কখনও রঙ বদলায়নি। মোড়ের মাথা থেকে একটা রিকশা নিলো অর্ক, অল্পসল্প সাহেব হয়ে গেছে ও, গরম রোদে হাঁটতে ইচ্ছে করলো না তাই।

কিছু লোকের চেহারা কখনও বদলায়না, সুপ্রতিমেরও সেরকম, সেই আগের মতই সামনের দিকে টুপি বানানো চুল, ঠোঁটের কোণে সবসময় একটা হাসি আর চোখে মুখে বাচ্চাদের সারল্য। মহাপ্রভু ঘাটের পাশের অশ্বত্থ গাছের তলায় বসল দুজন। এখনও ঠাণ্ডা ঠিক করে পড়েনি, কিন্তু দুপুরের পর থেকে সময়টা যখন বিকেলের দিকে গড়ায়, তখন গঙ্গানদীর উপরে কেমন একটা ধোঁয়াশার আস্তরণ পরে। অর্কর ভারি ভালো লাগে এইসময়টা। কেমন একটা শান্ত হয়ে ওঠে চারপাশটা, যেন একটা ছোট্ট বিরতি, তারপরেই আবার গা ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠবে সব কিছু।

কথা বলতে বলতে কখন সময়টা কেটে গেলো, বোঝাই গেলো না, কখন সেই আড্ডার মাঝে তিন কাপ চা উড়ে গেছে, কখন একটা গোটা গোল্ড ফ্লেকের প্যাকেট শেষ হয়ে গেছে, খেয়াল করেনি কেউ। আড্ডার মাঝে ব্যাবসা উঠেছে অনেকবার, চাকরির কথা এসেছে, কখনও বা উঠে এসেছে দীপ্তি। যেমন ভাবে একটা দিনের ছায়া লম্বা হয়, যেভাবে ছোটো ছোটো পা ফেলতে ফেলতে একদিন একটা বাচ্চা হাঁটতে শুরু করে, যেভাবে একটার পর একটা ইট গেঁথে তৈরি হয় বাড়ী, সেভাবে অনেক অনেক ঘটনা, স্মৃতি, আনন্দ ভালবাসা মিশে তৈরি হয় একটা সম্পর্ক, কখনো তাকে আমরা বলি বন্ধুত্ব, কখনো বলি দাম্পত্য, কখনো বলি ভাইবোনের খুনসুটি।

ছাদের উপর বসেছিল ওরা, ওরা মানে অর্ক আর অনু। অনুর অফিস থেকে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে যায়, কখনও রাতও হয়। অর্ক অপেক্ষা করে থাকে এই সময়টার, অনু এলে ওরা ছাদে চলে আসে, তারপর ঘণ্টাখানেক গল্প আর আড্ডা। আচ্ছা দাদা, সুপ্রতিমদা এখন কি করছে রে? অনু জিজ্ঞাসা করল অর্ক কে। এই একটা প্রশ্নের উত্তর এতক্ষন থেকেও ঠিক বুঝতে পারেনি অর্ক, কেমন একটা ভাসা ভাসা উত্তর এসেছে, কখনও কথা শুনে মনে হয়েছে স্কুলের ছেলেমেয়ে পড়ায়, কখনও মনে হয়েছে থিয়েটার করে, কখনও মনে হয়েছে ব্যাবসা। অর্ক খেয়াল করেছিল কাজের কথা বললেই কেমন একটু পাশ কাটাচ্ছিল যেন সুপ্রতিম। ও পুরোটাই খোলসা করে বলল অনু কে, অর্ক দেখেছে, কিছু জিনিসে অনুর মাথা খোলে ভাল।  সব শোনার পরে অনুও ঠিক বুঝতে পারল না।

একটা সময় ছিল যখন ওদের বাড়ির ছাদ থেকে এয়ারপোর্ট এর আলো দেখা যেত। তারপর কত বড় বড় বাড়ী হল, রাস্তায় লোক বাড়ল, দূষণ দখল করে নিলো খোলা আকাশটা। আজকাল মানুষের কথাবার্তাও কেমন যেন পাল্টে গেছে, মানুষ আর আজকাল তর্ক করে না, হয় গুগল দেখে মিটমাট করে নেয়, অথবা একটু কথাবার্তার পরেই সটান জামার কলার ধরে টান দেয়। টানা পঁয়ত্রিশ বছরের বামশাসন শেষে মানুষ একটা কথা বুঝতে শিখেছিল, কোনও কিছুই চিরন্তন নয়। নিচের ঘর থেকে মায়ের গলার আওয়াজ শুনতে পেল অর্ক। নন্তু এসেছে। নন্তু অর্কর পাড়ার বন্ধু। মফস্বলের পাড়া, বন্ধুত্ব ছোটবেলা থেকে হয়। নন্তু ব্যাবসা শুরু করেছে, ছোটো একটা কারখানা খুলেছে মোমবাতি, ধুপ এইসবের।

কলকাতা শহরটা এই শেষ দশ বছরে অনেকটা বেড়েছে, উত্তরদিকের বৃদ্ধিটা একটু বেশিই। আগে লোকে ব্যারাকপুরকে কলকাতা ভাবত না, এখন আলাদা ভাবে না, বরানগরকে পর্যন্ত ভাবা হতোনা কলকাতার মধ্যে, এখন ভাবা হয়। যদিও ওটা কর্পোরেশনের এলাকার মধ্যে পড়ে না, কিন্তু তাহলেও আজকাল সেখানে মল হয়েছে, রাস্তা বড় হয়েছে, ফ্লাইওভার আর রাতের আলো দেখে বোঝা মুশকিল একটা সময় ডানলপ ব্রিজের নিচ দিয়ে লোকে যেতে ভয় পেতো, এতটাই ট্রাফিক জ্যাম হত সেখানে। এখন উপর দিয়ে বম্বে রোড গেছে আর নিচে ঝাঁ চকচকে কালো পিচের রাস্তা। একটার পর একটা বড় বড় দোকান আর ইলেকট্রিকাল জিনিসের দোকান। ওই রাস্তা ধরে আরও একটু এগিয়ে গেলে দুধারে চোখে পড়বে ধীরে ধীরে সেই মান্ধাতা আমলের বেশবাস ছেড়ে শহরও বেশ পাল্লা দিয়ে সেজে উঠেছে। হলদে রঙের ট্যাক্সিগুলো আগে বরানগরই আসতে চাইতো না, এখন দিব্যি ব্যারাকপুর অব্দি চলে আসে। দুধারে সদর্পে বেড়ে উঠেছে বহুতল অট্টালিকা আর তার মাঝে ঝুপ করে একটা বহু পুরনো সভ্যতা কেমন যেন হটাৎ করে বড় হয়ে গেছে।

ক্লাস এইটে পড়ার সময় যেমন হটাৎ করে ছোট ছোট ছেলেগুলো লম্বা হয়ে যায় আর তারপরে হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট পরে নেয়, ঠিক তেমন করে শহরটা গায়ে গতরে বেড়েছে, একটু আধটু জেল্লা বাড়িয়েছে সময়ের সাথে সাথে। খড়দা পেরলে একটা সিনেমা হল পড়ত, প্রফুল্ল নামে, সে কবেই বন্ধ হয়ে গেছে, এখন বেশ কিছু মাল্টিপ্লেক্স হয়েছে, সকালে বিকেলে আলাদা আলাদা টিকেট, আলাদা আলাদা সিনেমা, ভেতরে আর বেঞ্চ পেতে দেখতে হয় না, সকালবেলা নীল সিনেমা চলে না, এখন এসি চলে, টিকিটের দাম একটু বেশি ঠিকই কিন্তু কেনার ক্ষমতাও তো অনেক বেড়েছে।

অর্ক আজ শহরে ফিরছে প্রায় দেড় বছর পরে। শহরের ছোঁয়ালাগা শহরতলীর স্কুল পেরিয়ে, সময়ের দাবি মেনে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশুনা করে আজ একটা বেসরকারি জায়গায় কাজ করছে বছর পাঁচেক হল। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, রাস্তা ঘাট, ব্রিজ বানানো তার কাজ, সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে কম্পানির গাড়ীতে চড়ে দশ কিলোমিটার যেতে হয়, তারপর সারাদিন শ্রমিকদের সঙ্গে মাথা খাটিয়ে, শরীরের সব ঘাম ঝরানোর পরে সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফেরা। বাড়ি বলতে কম্পানী যেখানে যেখানে রেখেছে।

মাঝের অনেককটা দিন বাড়ি আসার সুযোগ হচ্ছিলো না, আর তার বাবা মা’ও মাঝে ছোট করে ওর ওখানে ঘুরে গেছিলেন, তাই আর আসার তেমন দরকারও ছিল না। দীপ্তির সঙ্গে সম্পর্কটাও তো টিকলো না, তাই বাড়ি ফেরার তেমন আগ্রহ খুজে পায়নি অর্ক। কিন্তু এই কয়েকটা মাত্র দিনের মধ্যে শহরটাকে এভাবে বদলে যেতে দেখবে, ভাবতে পারেনি ও। প্রচুর আকাশছোঁয়া বাড়ি, শহুরে সিগন্যালের মধ্যে নিজেকে কেমন একটু একা একা মনে হচ্ছিলো। হাওড়া স্টেশনে ট্যাক্সির চীৎকার শুনে একবারও বুঝতে পারেনি এরকম একটা অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে তাকে। বড় বড় বাড়ির মাঝে একটাও খেলার মাঠ দেখতে পেলনা ও, বেশ কিছু নতুন স্কুল দেখতে পেল, কেমন যেন পাঁচিল দিয়ে শুরু আর পাঁচিল দিয়েই শেষ। বাইরে প্রচুর বাস দাঁড়িয়ে। ও যে সরকারি স্কুলে পড়তো, সেখানে বাস ছিল না, কিন্তু ছিল একটা প্রকাণ্ড খেলার মাঠ। চারদিকে গাছ দিয়ে ঘেরা। টিচাররা বেশ একটা গম্ভীর মুখ নিয়ে আসতেন পড়াতে, কখনও মারতেন বেত দিয়ে, কখনও আদর করে গাল টিপে দিতেন। রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে পা ছুঁয়ে প্রনাম করতে হত, বাবা মা শিখিয়েছেন, সবাই অপেক্ষা করতো কখন টিফিন টাইম হবে আর পিংপং বল দিয়ে খেলা হবে পিটটু। দোতলার বারান্দা থেকে উঁচু ক্লাসের দিদিরা তাকিয়ে থাকবে আর হাফপ্যান্ট পরা কচি বয়সের ধেড়ে পাকা ছেলেগুলো ভাববে, তারা কবে বড় হবে। এখনকার এই হলদে রঙের বাস থাকা স্কুলে কি এখনও এইসব হয়? এখনও কি তারা অগ্নি জেল পেন কিনে ভাবে কি দারুন একটা জিনিস! বা নটরাজ পেন্সিলের মাথা চিবিয়ে ভাবে যে দারুন খেতে! ওদের স্কুলে কি চাপকল আছে বা বাহাদুর দারোয়ান? অর্কর একটু ভয় পেল, এমন নয়তো যে স্কুলে ভর্তি হয়ে সময় নিয়ে বড় হওয়ার আগেই এরা বড় হয়ে যায়! সেই হলদে পাতা, লুকিয়ে পড়া বই পড়ার আগেই এরা সবকিছু জেনে ফেলে না তো! বেশিদিন নয়, মাত্র দশ বছর আগেই এরকম একটা স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বোকার মত তাকিয়ে থাকতো ও দীপ্তির দিকে। নিজের ক্লাস শেষ হলেই কোনও একটা অছিলায় বাইরে বেরিয়ে আসতো এই আশায় যে হয়ত দীপ্তিও বেরোবে, কখনও কখনও সেটা মিলেও যেত, আবার কখনও সকাল গড়িয়ে বিকেল হতো, সন্ধ্যে নামত পশ্চিমের আকাশে, কিন্তু দেখা মিলত না। অর্কর আর ভাবতে ইচ্ছে করছিলো না। ঠাকুর কর্নারের পাশের রাস্তা দিয়ে ট্যাক্সিটা ঘুরিয়ে ড্রাইভার মাথা ঘোরালো, জানতে চাইল কোন দিক দিয়ে যেতে হবে…

চলবে…

এরকম কিছু হলে কি হয়েছে, সেটা বলার দরকার পরে না। এখানে মাঝে মাঝেই পুলিশের ছোবল পড়ে, কখনও সত্যি লোক ধরা পড়ে আর কখনও যেকোনো লোক ধরা পরলেই চলে। রাতেরবেলা দৌড়াদৌড়ির শব্দ শোনা যায়, আর তার একটু পরে গ্রামের লোকের আওয়াজ আর রাস্তায় পড়ে থাকা একটা বা দুটো ডেডবডি। কখনও পুলিশের বডিও পড়ে থাকে, কিন্তু তখন শুরু হয় অত্যাচার, সব কটা ঘর খুঁজে দেখে, খাটের নীচ, গাছের ঝাড়, মড়াই কিছু বাদ থাকে না, কখনও তার মাঝেই এর ওর গায়ে একটু হাত দিয়ে মজা করে নেয় সরকারি কুত্তাগুলো। কিছু বললেই পুরে দেবে সীসার টুকরো আর ঘোষণা করে দেবে মাওবাদী বা দেশদ্রোহী। বিতান পরিস্কার বুঝতে পারলো তার ঘরের দিকেই আসছে আওয়াজটা, সে হাত দিয়ে ইশারা করে চুপ করতে বলল উত্তমকে, তারপর চুপ করে বসে থাকল। একটু পরে দুমদাম দরজায় আওয়াজ হল, সে ঘুম জড়ানো গলায় দরজা খুলে দিলো। তিনটে পুলিশ দাঁড়িয়েছিল বাইরে, একজনকে সে চেনে, আগেও দেখেছে এই গ্রামে, সেই প্রথম মুখ খুলল, উত্তমকে এদিকেই আসতে দেখলাম, তোর ঘরে নেইতো? বিতান বুঝল, সে পার্টি করে বলে এত ভদ্রতা দেখাচ্ছে, আসলে সব কটা শয়তানের গাছ, অন্য লোক হলে এতক্ষনে তার ঘরে ঢুকে নিজেরাই সব খুঁজে উপরন্তু পাশের ঘরে বউদির গায়েও হাত দিয়ে আসতো শালারা। সে মুখে কিছু প্রকাশ করলো না, মুখে বলল, এসেছিল একটু আগেই, জায়গা চেয়েছিল, বলেছিল পিছনে পুলিশ, কিন্তু সে জায়গা না দেওয়ায় বাঁদিকের রাস্তা ধরে দৌড়ে গেছে। এর বেশি আর কিছু জানে না সে। পুলিশগুলো চোখ ছোট ছোট করে এইসব শুনল, তারপরে কথা না বাড়িয়ে হাঁটা দিলো বা দিকের রাস্তা ধরে। বিতান আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো ওদের দিকে তাকিয়ে। বিশ্বাস নেই এই শুয়োরগুলোকে, কখন আবার ফেরত আসে সন্দেহ করে।

সারারাত আর ঘুম হয়নি তার, উত্তম পা ধরে প্রনাম করেছিলো, সে একটা লাথ মেরে বলেছিল, শালা তুই যে নকশাল, সে কথা বলিসনি তো! আমি জানতাম তুই সিপিএম করিস, তারপরে বুঝলাম তোদের পার্টিই বন্ধ হয়ে গেছে বলে এমনি ঘুরে বেরাস আর তুই শালা জঙ্গলের ডাকাত? সকাল হলেই ভাগবি, ভোরের বেলা, আর কেউ যদি দেখে তো ওখানেই একটা গুলি খেয়ে মরে যাস। আর কোনও কথা হয়নি।

সকালবেলা সাহেবের ওখানে যাওয়ার ছিল, মনোহরদা বলে রেখেছিলেন। সকালেবেলাতে আক্রা নদী খুব সুন্দর দেখায়, কেমন একটা তিরতিরে হাওয়া বয় আর বেশ কোমল একটা গন্ধ আসে নাকে। পলাইকে বলা ছিল কাল রাতের বেলা সাহেবকে মেয়ে সাপ্লাই করার কথা। পলাই নিশ্চয় করেছে, ওর কথার দাম আছে। এই গ্রামেও কোথা থেকে মেয়ে যোগাড় করে কে জানে! একবার একটা মেয়ে কে দেখেছিল বিতান, কালো গায়ের রঙ, ভরাট পিছনটা আর বুকের কাছটা, দেখলেই কেমন একটা মোচড় দিয়ে ওঠে বুকটা, মনোহরদা বলেছেন সব ভালো, মেয়েমানুষের পাল্লায় পড়া ভালো না, তাই বিতান একবার দেখেই চোখ সরিয়ে নিয়েছিল, তারপরে একবার আড়চোখে তাকিয়েওছিল, কিন্তু তখন মেয়েটাও ওর দিকে তাকিয়ে সব গোলমাল করে দিলো আর মনোহরদা দেখে ফেলে কটা কাঁচা খিস্তি মারলেন।

সাহেবের বাড়ির গেট খোলা, কাউকে জিজ্ঞাসা না করেই সে ভিতরে ঢুকে গেলো, ইটের রাস্তা পেরিয়ে বাড়িতে ঢোকার মুখেই গলার আওয়াজ শুনতে পেলো মনোহরদা’র। তারপরে দেখতে পেলো দুজনকেই, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। একটু ইতস্তত করে ওখানেই দাঁড়িয়ে গেলো বিতান। বেশ গলা চড়িয়ে কথা বলছিলেন মনোহরদা, সাহেবও মুখেমুখে জবাব দিচ্ছিলেন আধা হিন্দি, আধা ইংরিজিতে, বেশ বুঝতে পারছিলো যে ওদের মধ্যে একটা কিছু নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে। সে বাইরেই অপেক্ষা করতে থাকলো।

এখনও পুরোপুরি বর্ষাকাল আসেনি, বর্ষা এলে এইসব রাস্তায় আর হাঁটা যায় না, অল্পস্বল্প যেসব জমিজমা আছে, তাতেই চাষ আবাদ শুরু হয়ে যায়, আক্রা নদীতে জল বাড়লে রাত জাগে গ্রাম, কখন ঘর ছেড়ে উঠতে হয় স্কুল বাড়িতে! পূবদিকে একটা আমগাছে চোখ গেলো, বাঁজা আমগাছ, ফল নেই একটাও, আমগাছের নীচে একটা বেশ বড় উইপোকার ঢিপি, একটু ভাল করে বৃষ্টি হলেই এইসব ঢুকে যাবে মাটির তলায়। বিতান ভেবে পেলো না যে তখন উইপোকাগুলো বেঁচে থাকবে কি করে? যদিও উইপোকার থাকা বা না থাকার উপরে তার খুব একটা আগ্রহ নেই, তবু কেন মাথায় এল তার? এরকম হচ্ছে আজকাল, কিছু ভাবার আগেই একতাল চিন্তা এসে সব ওলটপালট করে দিচ্ছে। এমনিতেই তার মাথায় বুদ্ধি কম, গ্রামে আছে, ঘরের খাচ্ছে বলে চলে যাচ্ছে, বাইরে বেরোতে হলেই ‘হু হু বাওয়া’ হয়ে যাবে। সে মাঝে মাঝে অবাক হয়, ওদের গ্রামেরই লোক হয়ে মনোহরদা’র এতো কি করে বুদ্ধি! নিজের একটা দোকান আছে মোহম্মদবাজারে, সেটা নাকি বেশ ভালই চলে, বিয়ে করেনি আর এদিকে রাজনীতি করে বেশ নিজেরটা ভাল করে গুছিয়ে নিচ্ছে। আজকাল গ্রামের বয়স্ক লোকেরাও ওর কাছেই আসে শলাপরামর্শ করতে আর মনোহর’দাও বেশ গুছিয়ে জবাব দেন।

এরকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই আমগাছের পিছনের দিকটায় পৌঁছে গেছিলো বিতান। ডানদিকে, যেদিকে কলুখোলার মাঠটা আছে, সেদিকের ডালে একটা পাখির বাসা দেখতে পেলো সে, কোনও আওয়াজ না করে চুপচাপ সেদিকে এগিয়ে গেলো সে আর তক্ষুনি একটা দ্রুম করে শব্দ হল, ছিটকে বেরিয়ে এলো সে, বেশ কিছু পাখি, যারা কোনও গাছের ডালে বসেছিল, উড়ে গেলো আওয়াজ করে। বিতান দৌড়াতে শুরু করলো বাংলোর গেটের দিকে, কিছু একটা ভয়ানক হয়েছে সে বুঝতে পারছিল। সাহেবের ঘরের দিকে তাকাতেই সব পরিষ্কার হল, একটা চেয়ারের উপর উবুড় হয়ে পড়েছিল সাহেব, বলা ভালো সাহেবের ভারিক্কি চেহারাটা, আর অদ্ভুত শান্ত মুখ নিয়ে সামনেই দাঁড়ানো মনোহরদা। কাঠের দরজার একপাশ দিয়ে পাতলা একটা রক্তের ধারা তাজা স্রোত হয়ে বয়ে চলেছে। বিতান চীৎকার করে উঠলো, “মনোহর দা!”

চলবে…

অকল্যান্ড সাহেবের বাংলোর সামনে যখন এলো সে, দেখতে পেল ভেতরে সাহেব একটা হাফ প্যান্ট পরে বসে আছেন চেয়ারে গা এলিয়ে। বিতান অবশ্য একা যায়নি। মনোহরদা’ও ছিলেন ওর সাথে। মনোহরদা কি করতে গিয়েছিল, সেটা অবশ্য ও জানত না, জানার দরকারও ছিল না। ও শুধু গেছিলো মনোহরদা ডাকলেন বলে আর সাহেবের ঘরে একটু উঁকি মারতে। ও জানে যে ওরা খুব গরিব, বড়লোকের বাড়িতে একটু ভালমন্দ খেতে পেলে কি ক্ষতি?

সাহেব ওদের বসতে বললেন। একটু পরে একজন বেয়ারা এসে দুকাপ চা রেখে গেলো। মনোহর দা ওকে বললেন একটু দূরে সরে যেতে, আলাদা ভাবে কথা বলতে চান সাহেবের সাথে, সে আপত্তি করল না। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে বেরিয়ে এলো মনোহর দা, মুখে হাসি নিয়ে। গেটের বাইরে বেরিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে বললেন, “কাজটা হয়ে এলো রে, আরেকটা দিন লাগবে, তারপরে সামনের পঞ্চায়েত ভোটে আমাকে হারায় কে? শোন বিতান, তোকে একটা কাজ করতে হবে, গ্রামে ঢুকবি একটু ঘুরপথ দিয়ে, আমি অন্য রাস্তা দিয়ে যাবো। কাল সক্কাল সক্কাল বেশ কিছু ছেলেপুলে নিয়ে চলে যাবি জমির পাশে, আর শ্লোগান দিতে হবে। বাকি কাজ আমি কাল সকালেই বলে বুঝিয়ে দেবো। যা এখন ভাগ। বিতান দাঁত বের করে একটু হাসল, মনোহরদা ওর হাতে একটা বিড়ি দিলেন, তারপরে মোড়ের মাথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

উত্তরদিকে একটা বড় জামগাছ আছে, সেখানে এইসময়ে জাম পাওয়া যায়। বিতান একবার এদিক ওদিক দেখে নিলো, কাল সকালে যা করার, সেটা হল কিছু ওর মতই বিচ্ছু ছেলে জুটিয়ে সকালে চলে যেতে হবে ওই জমির কাছে আর চিৎকার করতে হবে যে গ্রামের জমি ছাড়বো না, পুঁজিবাদীর কালোহাত ভেঙ্গে দাও, গুড়িয়ে দাও, তারপরে মনোহরদা যাবেন ওদের তরফে কথা বলতে অকল্যান্ড সাহেবের সাথে, কিছু শর্ত দেবে আর অকল্যান্ড সাহেব সেটা মানবেন না, আবার সবাই চিৎকার করবে, তারপরে অকল্যান্ড সাহেব মেনে নেবেন অল্প কিছু দাবি র মনোহরদা আকর্ণ হাসি হেসে দেশ জয়ের কাজ সমাধা করবেন। এটা ও অনেকদিন ধরেই জানে। এর আগে একবার ইলেকট্রিক আসার কথা হয়েছিল সরকারের তরফে, সেখানেও এভাবেই কথা বলে কায়দা করে হিরো হয়ে গেছিলো মনোহরদা। সামনের ভোটে দাঁড়াবে এইবার, এখন থেকেই তার জমি তৈরি করছে। গ্রামের লোকও বোকা, ওই বাঁজা জমিতে চাষ আবাদ কিছুই হয় না, ফি বছর একবার করে মাটি খুঁড়ে পুকুর বানানোর খেলা করা হয়, সেখানে কারখানা হলে ক্ষতি কি, কেউ জানে না। পাবলিক বহুত বোকা, যে যেমন খাওয়ায়, সে তেমনই খায় আর এখান থেকেই বিতানকেও করে খেতে হবে। দাদার সঙ্গে জোত দেওয়ার কাজ তার পোষাবে না একেবারে। ভাবতে ভাবতে জামগাছের নিচে পৌঁছে গেলো সে, আর কপাল ভালো, হাতের কাছেই বেশ কটা পাকা পাকা জাম পেয়ে গেলো। কটা বউদির জন্যে পকেটে পুরে নিলো। ওর বউদিটা কেমন একটা হয়ে গেছে, তবে কেউ কিছু এনে দিলে বড় খুশি হয়। বাকি জামগুলো খেতে খেতে তাঁতিপাড়ার রাস্তা টা ধরল। এই রাস্তায় সন্ধ্যের পরে কেউ খুব একটা বেরোয় না।

সকালে যেমনটা ভাবা হয়েছিল, তেমনটাই হল, মজা দেখতে না ভয়ের জন্যে বেশ ভালোই ভিড় হয়েছিল। অকল্যান্ড সাহেব হাত পা নেড়ে অনেক কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন আর এদিকে মনোহরদা কিছুই শুনবেন না! শেষে অকল্যান্ড সাহেব অর্ধেকের বেশি কথা মেনে নিলেন, কথা দিলেন বাইরে থেকে নয়, বেশীরভাগ শ্রমিকই গ্রাম থেকে নেওয়া হবে, বটতলার মন্দির টা তৈরি করে দেওয়া হবে পাকা করে, রাস্তা গ্রামের মধ্যিখান দিয়ে নয়, পাশ দিয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। দুপুরে এলো প্যাকেট করা বিরিয়ানি আর বিকেলে এলো প্যাকেট করা মাল,মাল মানে চোলাই। বেড়ে নেশা হয়। দু’প্যাকেট টানার পর সত্যি মালুম হয় কেন বলা হয় রাজনীতি হল রাজার নীতি!

ঘুমটা সবে চোখে লেগেছে, আর সেই সময়েই উত্তমদা’র গলা পেলো বিতান, নিচুগলায় ডাকছিল দরজার বাইরে থেকে, উত্তমদা অন্য দলের লোক কিন্তু একই গ্রামে থাকে, ছোটবেলায় একসাথে অনেক ফুটবল খেলেছে সে, মনোহরদা বারবার বলে দিয়েছেন অন্য লোকের ডাকে রাতের বেলা দরজা না খুলতে কিন্তু তাই বলে উত্তমকে অন্য দলের লোক ভাবতে তার ইচ্ছে করলো না। একা উত্তমই দাঁড়িয়ে ছিল, বারবার পিছনে ফিরে দেখছিল আর কেমন একটা কাপছিল ও, তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকিয়ে নিলো বিতান, তারপরে দরজা টা বন্ধ করে হুড়কো টেনে দিলো।

চলবে…

No resemblance with anything in real. it is completely a innocent story. please do not relate to anything or any incidence.

“সন্তোষকে চিনতাম আমি বক্রপুর স্কুলে পড়ার সময় থেকে। আমার থেকে এক ক্লাস উঁচুতে পড়তো সে, আর ওর যে ছোট ভাইটা, যেও কাল পুলিশের গুলিতে মারা গেছে, আমার ক্লাসমেট ছিল, ভগবান নাম ছিল। ওরা কেমন ছিল, সেটা না’হয় অন্য লোকের কাছেই শুনে নেবেন, তবে এটা জানিয়ে রাখি, ওরা কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না, কোনোদিন হাতে বন্দুক দূরের কথা, একতা হেঁসো নিয়েও কারও সাথে লড়াই করেনি। আজ আপনাদের খবরের কাগজে তাদেরকেই নকশাল বলে চালিয়ে দিয়ে সরকার বুক ফোলাচ্ছে। সন্তোষ, ভগবান তো মোটে দুটো লোক, এই চলছে গত দশ বছর ধরে। কখনও সিপিএম এর লোক মারছে আমাদের, কখন তৃণমূলের লোক, আমরা মরছি আর আপনাদের সরকার আনন্দ করছে, কেন্দ্রের সরকার বাহবা কুড়চ্ছে, এ যেন কৃতিত্ব নেওয়ার খেলায় মেতেছে সকলে। আমরা তো কেউ রাজা হতে চাইনি, আমরা বলিনি আমাদের সবাইকে পাকা ঘর করে দিতে হবে, এটাও বলিনি যে আমাদের সবার সরকারি চাকরি চাই! আপনি শহরের বাবু, আপনি হয়তো বুঝবেন না, না খেয়ে থাকার যন্ত্রণা, কিন্তু এটা নিশ্চয়ই বুঝবেন যে নিজের না খাওয়ার থেকেও বড় যন্ত্রণা বাচ্চাদের না খাইয়ে রাখা। আমরা কখনও খেতে পাই, কখনও পাই না, আমরা সেটাই ভালভাবে বলতে চেয়েছিলাম, সরকার ভাবল এই গরিব লোকগুলো বড় জ্বালাতন করছে, এদের খেতে দাও। একমুঠো ভাতের বদলে পুরে দিল গরম সীসার টুকরো। ভালই হল, আর তো খেতে চাইতে হবে না, তিন মাইল হেঁটে এক কলসি জল আনতে হবে না, ভাবতে হবে না শেষবার যখন ভোট দিয়েছিলাম, তখনও যে বলেছিল কারেন্ট আসবে, সেটা কেনও এখনও এল না। যান সাহেব, গ্রামটা ঘুরে আসুন আর তারপরে সরকারের অনুমতি নিয়ে লিখবেন আমরা নকশাল কিনা। যদি আমরা নকশাল হই, মিথ্যা লিখবেন না, আর যদি না হই, সরকারের পরামর্শ ছাড়া ছাপাবেন না যেন।“ একটানা লম্বা কথা বলে থামল মহেশ, গ্রামে একটা প্রাইমারী স্কুলে পড়াতো। সেই স্কুল উঠে গেছে কিছুদিন হল। অর্ককে পেয়ে উগড়ে দিলো খানিকটা মনের জ্বালা।

কাল রাতে এখানে একটা অভিযান হয়েছে, সরকারি অভিযান, আসলে মিলিটারি অভিযান। আধা সামরিক বাহিনী দিয়ে পুরো অঞ্চলটাই ঢেকে রাখা হয়েছিল কড়া নিরাপত্তায়, আর নিরাপত্তাহীনতার জন্য যারা দায়ী, তারা কখনও পরিচিত নকশাল নামে, আর কখনও অধুনা মাওবাদী নামে পরিচিত সরকারের খাতায়। ওদের দেখা যায় না, খোঁজ মেলে না জঙ্গলের পর জঙ্গল চষে ফেললেও। কখনও বড়সড় অভিযান হয়, পুরোপুরি সামরিক অভিযান, একেবারে ঠিকঠাক সুত্রের খবর মোতাবেক হানাও দেওয়া হয় কিন্তু কিভাবে যেন হাওয়ার মত মিলিয়ে যায় এই বাজে লোকগুলো। ততক্ষণে খবরের কাগজের টিকটিকিগুলো ঝামেলা শুরু করে দেয়, ওদের খবর বেচা দরকার, আর অভিযানকারী দলের দরকার একটা সাফল্য, সেটা মিথ্যে হলেই বা জানছে কে? সরকার সেই সাফল্য বুকফুলিয়ে শতমুখে বলে বেড়াবে তাদের গণ্ডাখানেক ভোটের প্রচারে, পাবলিকও খায় ভাল এইসব খবর। আর এমনিতেও কিছু গরিব লোক, যাদের জন্যে সরকারকে জনগনের করের টাকা ব্যবহার করতে হয়, তারা না থাকাই ভাল।

চলবে…