Archive for the ‘Bengali’ Category

 

Jodi 01

হোটেল উর্বশীর পাশ দিয়ে গলিটা ধরে সোজা গঙ্গায় নেমে যাওয়ার রাস্তা দিন তিনেক আগেই খুঁজে পেয়েছিলাম। একটা বাঙ্গালি আছে, মানে একটা নয়, অনেকই আছে, তবে আমি বলছি বাঙ্গালি চায়ের দোকানের কথা, মধু নাম লোকটার। হৃষীকেশে আসার পরের দিনেই সকালবেলা দেখা। কথা বলতে বলতেই বুঝলাম, মানে সে বুঝল যে আমি বাঙ্গালি। অবশ্য আজ এই পঁয়ষট্টি হবো হবো বয়েসে ভারতের এগারোটা রাজ্যে কাজ করার পরেও আমার সঙ্গে কথা বলার পরে কেউ একটু সুযোগ পেলেই এটা জিজ্ঞেস করতে ছাড়েনি যে, আপনি বাঙ্গালি! আজব ব্যাপার, এতদিন, মানে প্রায় চল্লিশ বছর বাইরে কাটিয়েও আমার কথা শুনে নাকি দিব্য বোঝা যায় এই মালটা আলুপোস্ত ডাল ভাত ছাড়া বোঝে না। অবিশ্যি তাতে আমার খুব একটা কিছু যায় আসে না। তা যা বলছিলাম, তো সেই মধুর দোকানে এক কাপ গরম গঙ্গাজল, যেটাকে ও এখানে চা বলে দিব্য চালিয়ে যাচ্ছে, সেটা খেয়ে ঘণ্টা খানেক চক্কর মেরে দেখে আসি দেশি বিদেশিগুলো কেমন সব শরীর চর্চা করছে সক্কালসক্কাল। বলতে গেলে এটা আমার ফ্রিতে চৌকিদারি আরকি! ওরাও আমাকে পাত্তা দেয়না, আমিও মোটেই পাত্তা খুঁজি না। উর্বশী হোটেলের পাশের রাস্তাটা আমাকে মধুই বলেছিল। মধু লোকটা বেশ অদ্ভুত। মধ্য বয়েসি লোক, হৃষীকেশে চা বেচছে প্রায় দশ বছর। আস্তে আস্তে এখানেই সব গুছিয়ে নিয়েছে। নিজে থেকেই কথা বলে, নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়। এই যেমন আজই সকালে এরকম একটা ঘটনা হল, জানেন কাকা, আজকাল এই বিদেশীদের চক্করে ড্রাগের ব্যেবসা খুব বেড়ে গেছে, আসবে সব যোগের নামে, তারপর এখানে ওখানে ব্যোম ভোলে বলে শুয়ে পরবে এর ওর সাথে, ওদের দেশে তো এইসবই চলে। একদিন সকালে দেখি আমার দোকানের সামনে শুয়ে আছে, গায়ে কাপড় চোপর নেই বল্লেই চলে, কিন্তু বিদেশি, কিছু বলার নেই, হই হই করে ঘুম থেকে তুলে এক কাপ চা খাইয়ে বিদায় করলাম। চা খাবে কি, মুখ দিয়ে তখনও নেশার ঘোর কাটেনি। পুলিশও সব জানে, কিন্তু কারুর কিসসু করার নাই, অতিথি দেবো ভব। আমার চা খাওয়া শেষ হলে, আমিও উঠে পড়ি।

এইবার নিয়ে চার বছর হল, আমি, মানে আমরা প্রত্যেক শীতের সময় এখানে এসে দিন দশেক কাটিয়ে যাই। স্ত্রীটি আমার শীতকাতুরে, সে সক্কাল সক্কাল বেরোতে চায়না, আর আমার আবার সকাল হলে ঘরের মধ্যে বসে থাকতে ইচ্ছে করেনা। গতবছরে এখানেই একটা হোটেলের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে নিয়েছি বছরে দশদিন থাকবো বলে, সে ব্যাটাও বাঙ্গালি, তাই বুড়ো-বুড়ীকে হই হই করে স্বাগতম করে। আর এমনিতেও শীতকালে দিল্লির ঠাণ্ডাতে কাঁপতে থাকা জনতা খুব একটা এদিকে আসে না, খালি খালি থাকে বেশ সব কিছু। আমি সেই সকালবেলা একটা জ্যাকেট, একটা শাল আর একটা লাঠি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি বিদেশীদের কসরত দেখতে। স্বদেশি খুব একটা দেখা যায় না সকালে, বিকেল থেকেই তাদের সময় শুরু হয়, চানাচুর, মাংশ আর রামের বোতল নিয়ে বসে পড়ে ঘরের মধ্যে। আমিও গিলি, কিন্তু আমার আবার রামে ভক্তি কম, তাই সাহেবি বোতল নিয়ে গত ত্রিশ বছরের মত আজও মৌনব্রত নিয়ে বসে বসে টিভি দেখি। আমার স্ত্রী তখন হয় মোবাইলে, নয়তো একটা বই নিয়ে বসে থাকে। সত্যি, এটা একটা মজার ব্যেপার, আমাদের কথা বার্তা মোটামুটি বিয়ের দু-বছরের মধ্যেই হয়ে গিয়েছিলো, তারপরের তিন বছর চেষ্টা চলেছে কথা খুঁজে বের করার, কিন্তু পাওয়া যায়নি, যেমন আমার নতুন কিছু কথা আসেনি, তারও তেমনই। আমাদের ছেলেপুলেও নেই যে তার সংসারের বেগুন আলু মুলোতে নিজের মাথা লাগাবো, তাই একদম সুন্দরভাবে দুজনে মিলেই একটাই ঘরের ভিতর একসঙ্গে যে যার মতন জীবন কাটাচ্ছি।

মোবাইল ব্যাপারটা আমার ঠিক ধাতে আসে না, আমি বরং কম্পিউটারে বেশ সড়গড়। আমার বউ এর উলটোটা, সে মোটামুটি কাজের লোককেও পারলে মোবাইলে লিখে নির্দেশ দেয়। বাইরের লোকের সঙ্গে কথা কমাতে কমাতে এখন আর তেমন আমাদের খোঁজ খবর রাখারও কেউ নেই, আমরাও আজকাল আর তেমন খোঁজ খবর খুব একটা রাখিনা দেশদুনিয়ার। কোথায় কার বাড়ি লাউএর ঝোল রান্না হয়েছে আর কার ছেলে মেয়ে আমেরিকা গিয়ে বকফুলের বড়া বানিয়ে খেয়েছে বা কার নাতি বেঙ্গলি তে কথা বলতেই পারে না, এইসব শোনার বা শুনে বেশ একটা বিজ্ঞ বিজ্ঞ মন্তব্য করার দরকার পড়ে না। সাতে নেই, পাঁচে নেই, বউ এর সঙ্গেই পঁয়ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনের মধ্যে গত ত্রিশ বছরে মেরেকেটে ত্রিশটা কথা, যেটা কিনা এখনও মনে আছে, বলেছি কিনা সন্দেহ। চুটিয়ে চাকরি করেছি, প্রচুর জায়গা ঘুরেছি কিছুটা বেড়ানোর তাগিদে, কিছুটা চাকরির জন্যে আর সত্যি বলতে লজ্জা নেই, বাকিটা লোক দেখাতে। হ্যাঁ, মিস্টার মিত্তির চললেন অস্ট্রেলিয়া, তো পরেরবার আমাকেও একটা নিউজিল্যান্ড ভ্রমন করতেই হবে! তবে এইসব করেও বিন্দাস চালিয়ে গেছি জীবন।

ভাল একটা চাকরি ছিল, বেসরকারি কিন্তু ভাল মাইনে। জীবনের প্রথম তিন বছর খুব কম টাকায় চাকরি করেছি, তারপরে সবই বেশ মোটা মাইনের। প্রথমের দিকে জমানোর টাকা থাকতো না, পরের দিকে কিছুদিন জমানোর পরে বুঝলাম এর কোন মানেই হয়না, কিন্তু তাহলেও বেশ কিছু টাকা জমে যেত, তার একটা বড় কারন যদিও আমাদের ছেলেপুলে না থাকা, হাসপাতালের খরচা নেই, পড়ানর খরচা নেই, আবদার মেটানোরও দরকার নেই, তাই বাষট্টি বছরের পরেও যখন দ্বিতীয় বারের জন্যে আমার কন্ট্রাক্ট আরও দুবছর বাড়ানোর কথা উঠল বোর্ডের মীটিঙে, আমি সোজাসুজি না বলে দিলাম। সাদা জামা, কাল প্যান্ট আর চকচকে জুতোর জীবন অনেক হয়েছে, এবার মরার আগে ঢিলে পাজামা আর তার উপরে আরও ঢিলে কুর্তা পরে কটা দিন একটু আরামে কাটাতে চাই। কিন্তু এটারও একটা সমস্যা আছে, একরকমের জীবন ছেড়ে পরেরদিনই অন্য জীবনে ফেরা কিন্তু খুব সহজ হয়না, কিন্তু কপাল ভাল আমার, আমি প্রথমদিন থেকেই একেবারে স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠলাম। তারপর থেকে শীতকালে দশদিনের জন্যে হৃষীকেশ, গরমকালে দশদিনের জন্যে দার্জিলিংটা আমি বা আমরা মোটামুটি ঠিক করেই রেখেছি। বর্ষাকালে আমাদের বিবাহবার্ষিকী, তাই বর্ষাকালে কোথাও যাওয়াটা আমাদের দুজনের একটা মীটিঙের পরে ঠিক হয়। আমার পছন্দ আমার স্ত্রীর পছন্দ হয়না, আবার আমার তাঁর পছন্দ পোষায়না, কিন্তু বেড়ানোর তাগিদে দুজনেই দুজনের অপছন্দটা সহ্য করে এগিয়ে চলি, যেভাবে চলেছি এতটা পথ। এইবার গেছিলাম শ্রীলঙ্কা।

যাইহোক, মধুর দোকানে ফেরা যাক, যেহেতু কম কথা বলে অভ্যেস হয়ে গেছে, আর এদিকে বয়েসটাও বেড়েছে অনেকটাই, তাই একটা কথা লিখতে গেলেই অনেক কথা চলে আসে। মধুই বলেছিল পাশের একটা গলি দেখিয়ে, ওটা দিয়ে গেলে একটা ঢাল পড়বে, আর সেটা দিয়ে নেমে গেলেই নাকি গঙ্গা। গত তিনদিন ধরে এই রাস্তাটাই ফলো করছি। সকালবেলা দারুন ঠাণ্ডা একটা হাওয়া দেয়, মাফলারটা ভাল করে জড়িয়ে সেটা দিয়েই নেমে যাই।

শুক্রবার, সকালের দিকে ভিড় একেবারেই থাকেনা, বিকেলের থেকে অল্প অল্প করে লোক বাড়ে, সবই পরিযায়ী পাখি, তীর্থের নামে মদ গিলতে আসে, আমার মতই ভণ্ডের দল আর এইজন্যেই আমার ভাল লাগে এই হৃষীকেশ। এখানে তীর্থ আছে, রাতেরবেলা বাইজী নাচের কাছাকাছি মোচ্ছব আছে, বেওসা আছে আর খোঁজ করলে বেশ্যাও নিশ্চয় পাওয়া যাবে বলেই আমার বিশ্বাস। লোকে এখানে যোগা করে, রাতেরবেলা ভোগা করে। সব থেকে ভাল লাগে এটা দেখে যে এইসব কিছুই কেমন একটা ঘোমটার আড়ালে। এখানে তীর্থও হয় অন্যরকমভাবে। মানে যদিও এটা হরিদ্বারের উপরে, কিন্তু তীর্থ-গুরুত্বের মাপকাঠিতে কম, আবার এখান থেকে আরও উপরে উঠে গেলে দেবপ্রয়াগ, তারও উপরে কেদারনাথ, বদ্রিনাথ। অর্থাৎ ঠিক মাঝামাঝি একটা গুরুত্ব নিয়ে সমতল আর পাহাড়ের মাঝামাঝি জায়গায় থেকে যোগা থেকে ভোগা উপহার দিচ্ছে এই জায়গা। এখানে অনেকবছর আগে বিটলস এর লোকেরা এসেছিল আত্মানুসন্ধান করতে, এখানেই সেই বিখ্যাত নীলকণ্ঠমুনির মন্দির, আবার এখানেই প্রত্যেক গঙ্গার ঘাটে লুকিয়ে গাঞ্জা আর শহর থেকে ছুটি নিয়ে সময় কাটাতে আসা তরুন তরুণীর মিলনের জায়গা। এখানে কিছু দোকানে মাছ মাংশ পাওয়া যায়, কিন্তু প্রকাশ্যে নয়, বলে রাখলে দু-তিন ঘণ্টা পরে পাওয়া যাবে। রামঝুলা আর লক্ষ্মণঝুলার মধ্যে কোনটা বড়, তা নিয়ে তর্কের অবকাশ না থাকলেও কোন যোগে শরীরের কোন জায়গার ঠিক কতটা উপকার হবে, তা নিয়ে প্রচুর লোকের প্রচুর তর্ক প্রত্যেকটা দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে, আর তাদের কথা অনুযায়ী তাদের পদ্ধতিটাই সব থেকে ভাল। আমি অবিশ্যি আমার পদ্ধতিতেই চলি।

আমি যাওয়ার সময় এইসব ভাবতে ভাবতে মধুর দোকানে এক কাপ চা খাই, তারপরে ঠিক একটি ঘণ্টা হাঁটি, মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে যায়, ফুসফুসটাও কেমন একটা দম পায়, তারপরে ফেরার সময়ে আরেক কাপ চা গিলে আয়েশ করে কলকাতা থেকে নিয়ে যাওয়া বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে হোটেলে ফিরে আসি। গত কয়েকদিন ধরে বুকের বাঁদিকে একটা চিনচিনে ব্যাথা হচ্ছে, আর বয়েসটা এমনই যে কিছু হলেই মনে হয় কিছু হয়ে যাবে। এমনিতে কিছু হয়ে গেলে তাতে আপত্ত্যি বেশি কিছু নেই, কিন্তু না বলে কিছু হয়ে গেলে নিজেরই হয়ত একটু খারাপ লাগবে।

সে যাই হোক, আজ সকালের দিকে একটা ঘটনা ঘটেছে, আমি ফিরছিলাম ত্রিমূর্তি গুরু দত্ত আশ্রমের পাশ দিয়ে, হঠাৎ করে মনে হল একটা চেনা ছায়া পাশ দিয়ে চলে গেল। তবে চেনা বলা ভুল, অন্তত আজ চল্লিশ বছর পরে তাকে চিনে ফেলার প্রশ্নই আসেনা, কিন্তু কখনো কখনো এমন কিছু ঘটে যায় যে চমকে উঠতে হয়, আর সেই ঘটনার ঘোর কাটাতে সময় লাগে।

বয়েস বাড়ার পরে একটা জিনিস বুঝতে পারি, জীবনে যা কিছু ঘটে, সব কিছু ঘটতে দেওয়াই ভাল। ভাল জিনিস হয়ত তেমন মনে থাকেনা, কিন্তু দুষ্টুমি, বা যত বাজেকাজ, সব ঠিক মনে থেকে যায়, আর কখনো কখনো নিজের অবচেতনেই নিজেরাই হাসতে পারি, বা হয়ত মনে করে ভাবতে পারি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমার মনে পড়েনা আমি জীবনে কতবার প্রথম হয়েছি স্কুলের পরীক্ষায়, কিন্তু এটা ঠিক মনে আছে যে প্রথমদিনেই আমাকে কান ধরে দাঁড়াতে হয়েছিল।

মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট বয়েসের প্রমান ছাড়া আর কোন কাজে লাগেনি পরবর্তীকালে, কিন্তু সার্টিফিকেট আনার সময়টা মনে আছে, আমরা পাঁচ বন্ধু মিলে ভাবছিলাম অন্যস্কুলে ভর্তির ফর্ম তুলবো কারন সমীরণের বান্ধবী আমাদের স্কুলে নয়, ভর্তি হবে নাকি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী স্কুলে। তারপরে যদিও সে দরকার পরেনি, কারণ সায়নি আমাদের স্কুলেই ভর্তি হয়েছিল আর সমীরণের জীবনের প্রচুর ব্যাথার সঙ্গে আরও একটি ব্যাথা যোগ করে চলে গিয়েছিলো অনেকদুরে, যে দূর থেকে আর কখনও ফেরা যায়না।

টানা তিনমাস সমীরণ আমাদের কয়েকজনের সঙ্গে ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলেনি, যতক্ষণনা তাঁর চোখের জল মুছিয়ে দিতে মালবিকার আবির্ভাব ঘটে। মালবিকার আবির্ভাবের পরে টানা ছয়মাস আমাদেরও দরকার পড়েনি, যতক্ষণনা সায়নি সমীরণকে ছেড়ে সময় কাটাতে শুরু করে সৌম্যের সাথে আর সমীরণ আবার নিজেকে আমাদের দলে সমর্পণ করে। সমীরণের ঠিক কতগুলি প্রেম ঘটেছিল, সেটা ও কলেজের থার্ড ইয়ার থেকেই মোটামুটি ভুলে যেত, তবে তখনই কম করে হাফ ডজনের থেকে কম ছিলনা, আর প্রেম যখন ছিল, তখন ব্যাথাও ছিল, আর ব্যাথাও যখন ছিল, তাই আমাদেরও দরকার ভালমতই ছিল, আর সমীরণ আমাদের এত ভাল বন্ধু ছিল যে তাঁর ব্যাথা মানে আমাদের সাহারা মরুভুমির মধ্যেও মউসিনরামের উদয় ছিল প্রায় দ্বিমাসিক ঘটনা। সমীরণের একটা করে ব্যাথা বাড়বে, আর সেটা ভোলার জন্যে সবার আগে আমাদের জমায়েত হত ছউঘুপির মাঠে, তারপরে প্রচুর সিগারেটের সাথে আমরা সব ফেলু মিত্তিরের মত ঘটনার কারন অনুসন্ধানে ব্যাস্ত হয়ে পরতাম আর সেই সুযোগে সমীরণ আবার অন্য কাউকে তাঁর চোখের জল মোছানোর সঙ্গী বানিয়ে নিত। পরের দিকে আমরা আমাদের এই কাজের নাম দিয়েছিলাম পর-বিবাহ-নর্তকী, মানে নিজেদের যেন বিয়ে হওয়ার নয়, তাই অন্যের বিয়েতেই নেচে আসি, সোজা কথায়, বান্ধবীর খোঁজের দরকার নেই, সমীরণের গণ্ডাখানেক বান্ধবীদের নিয়ে চর্চাতেই ব্যাস্ত ছিলাম।

সেই সমীরণের সাথেই আমার বন্ধুত্বটা শেষ হয়ে গেছিলো ওরই এক সম্পর্কের টানাপড়েনে। কলেজের পড়া শেষ করে আমি তখন সদ্য চাকরিতে ঢুকেছি, নকশাল আমলের লড়াইতে আমাদের সেভাবে পরতে হয়নি, কিন্তু রাজনৈতিক টানাপড়েন দেখা হয়েগেছে, কংগ্রেসের যুগ শেষ হয়ে লাল সেলামের আমলে আমাদের সব থেকে বড় সঙ্গী ছিল রাজনৈতিক চেতনা, মনে হত, মার্ক্স আর এঙ্গেলের সাথে আমাদেরও দেশে আস্তে আস্তে সমাজবিপ্লবের বন্যা বয়ে যাবে, আমাদের দেশেও প্রত্যেকটা মানুষ খেতে পাবে, রাতে শোয়ার জন্যে পাবে একটা ছাত, আর কোন শিশু অপুষ্টির শিকার হয়ে মরবে না, আর ভিয়েতনামের লোকেরা আমার আপনজন, আমার নিজের ভাইয়ের থেকেও আপন। রাষ্ট্রে ইন্দিরা গান্ধী, কখনও জোট সরকার, বাংলায় স্লোগান তুলতাম, তোমার নাম আমার নাম, আমার দেশ ভিয়েতনাম, বা কখনও, এ স্বাধীনতা ঝুটা হে, কিন্তু এভাবেই আস্তে আস্তে নিজের একটা পরিচিতি তৈরি হয়ে গেছিলো। লোকে জানত আমাকে বামপন্থী হিসেবে। আর বামপন্থার পুরস্কার পেলাম একটা চাকরি। যে কোম্পানিতে চাকরি পেলাম, সেখানেই ছিল সমীরণের দ্বিতীয় প্রেম মালবিকা। রোজই একসাথে যাতায়াত, একসাথে কাজ করার সুবাদে ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম মালবিকার সাথে। তবে তখনকার ঘনিষ্ঠতা এখনকার মত চুমু দিয়ে শুরু হত না। ঠিক মনে নেই, কিন্তু চুমুতে পৌঁছতে একবছরের বেশি সময় লেগেছিল। শহরতলীর ছেলে আমি, আর আমাদের বন্ধুত্বের একটা ঘনিষ্ঠ দল ছিল। আমরা ছয়জন ছিলাম খুবই কাছের, আর তাতে অতি অবশ্যই সমীরণ ছিল। বন্ধুদের মধ্যে আমার সম্পর্কের কথা পৌঁছতে দেরি হল না, ছউঘুপির মাঠে সবার সামনে আমাকে আমাদের বন্ধুত্বের আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হল, আর কি করে জানিনা সবার মধ্যেই আমাকে নিয়ে, আমার বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন উঠে গেল, আর সেদিন সন্ধ্যেবেলায় যখন আমরা আমাদের সাইকেল নিয়ে উঠলাম, আমি বুঝতে পারলাম, ওরা আর কেউ আমার বন্ধু নয়, আমি আর দরকারি নই তাদের কাছে!

আমিও আর যাইনি বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে তাদের কাছে, মালবিকার সঙ্গে সম্পর্কটা হারিয়ে গেল পারিবারিক টানাপড়েনে। মালবিকার বাবা পাত্র খুঁজে আনলেন আর আমাদের সম্পর্কের পূর্ণতা দাবি করার আগেই বিয়ে হয়ে গেল তার। সেই ঘটনার পরে চল্লিশ বছর কেটে গেছে। আমি চাকরি নিয়ে চলে যাই দিল্লী। তারপরে আস্তে আস্তে পদোন্নতি, নিজেরও বিয়ে। মন থেকে মালবিকা মুছেই গেছিলো, বা মাঝেও খুব একটা কিছু মনেও পড়েনি, সমীরণের হয়তো দ্বিতীয় প্রেম ছিল, কিন্তু আমার প্রথম প্রেম কিন্তু মালবিকাই। তাহলেও আমার এইসব ঠুনকো অনুভবের বড়ই অভাব, তাই যেদিন মালবিকা ছেড়ে চলে গেছে, সেদিন থেকে আমিও আর তার দিকে তাকাইনি, না, সমীরণ বা অন্য কারও কাছেও আবার বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে ফেরত যাইনি। যে পথ চলে গেছে, আমি সেই পথেই চলতে পছন্দ করি।

কিন্তু আজ হঠাৎ কি হল জানি না, সেই সবজে রঙের শাড়িপড়া, কাঁচাপাকা চুলের চেনা ছায়াটা বড্ড চেনা চেনা লাগছে। আমি আবার সেই রাস্তা ধরলাম, যে রাস্তা দিয়ে একটু আগেই ফিরে এসেছি, যে রাস্তা দিয়ে একটু আগেই হয়তো আমার চেনা ছায়া এগিয়ে গেছে উলটোদিকে। মহীপালের রুদ্রাক্ষের দোকানটা পার হতেই চোখে পরে গেল সেই মুখ, সে মুখ ভোলার নয়, চেনা ছায়া সত্যিই আমার চেনা, অন্তত কখনও চেনা ছিল। সঙ্গের ভদ্রলোকটিকে নিয়ে মধুর দোকানে মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছে। আমাকে এগোতে গেলে তাদের পেরিয়ে যেতে হয়, পিছতে গেলে কেমন একটু অদ্ভুত লাগে, কিন্তু কিছু করার নেই, বয়েসের সাথে নিজের পা’ও কেমন অনিশ্চয়তায় ভুগছে, আমি বোধয় তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকেই, তখনই আমার দিকেই চোখ পড়লো ওর, আর তখনই আমার পায়ে সাড় ফিরে এলো, আমি হঠাৎ কিছু মনে পড়েছে ভাব করে ফেরার রাস্তা নিলাম, ঠিক বুঝতে পারলাম না আমাকে চিনেছে কিনা বা তার চোখে মুখে কিছু ভাবান্তর হল কিনা, বা দূর থেকে ঠাহর করতে পারলামনা কোন দীর্ঘশ্বাস পড়লো কিনা।

 

Debraj

(Pic Courtesy:Google)

27.06.2018

Mumbai

Advertisements

bermudaভাবা আর করার মধ্যে যতটুকু গ্যাপ লোকের থাকে, আমার তার থেকে একটু হলেও বেশি থাকে, আমি বাপু ভাবতে ভালবাসি, করতে মোটেই ভালবাসিনা আর ভাবনা লিখে ওঠার কথা মাঝে মাঝে ভাবতে ভাবতে আমি আবার ভাবতে বসে যাই। কিন্তু আজ আমি ঠিক করেছি লিখবো, জম্পেশ একটা ভাবনার কথাই লিখবো, সেটা লিখতে গিয়ে আমার ঘুম এসে গেলেও আমি লিখবো, আর লিখতে লিখতে আরও বেশি ভাবনা এসে গেলে সেগুলোকেও আধপেটা করে পিটিয়ে টুপটাপ লিখে ফেলবো। লেখার আগে আমার লেখার কায়দা কানুনগুলো একটু ঠিকঠাক করে নিতে হয়, তার মধ্যে প্রথম হল দরজা জানলা বন্ধ করা, দ্বিতীয় হল ল্যাপটপে সবকটা শপিং সাইট বন্ধ করা, তারপরে তিনটি গুনে গুনে সিগারেট বাবার প্যাকেট থেকে ঝেড়ে খাটের তলায় লুকিয়ে ফেলা। এইসব হয়ে গেলে আসে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, খানিকক্ষণ ভাবলাম সেটা লেখা ঠিক হবে কিনা, কিন্তু ঠিক ভুল ভাবতে বসলে আমি আবার ভাবতেই থাকব, লেখা আর আমার দ্বারা আজ হচ্ছে না। হ্যাঁ, সোজা-সাপটা বলে দি, আমি অন্তর্বাস পরে লিখতে পারিনা, তাই সবার আগে সেটা ত্যাগ করি, তারপরে বাবার অনেক পুরনো একটা জ্যেলজ্যেলে ফতুয়া আছে, সেটা গলিয়ে নি, আর নীচে অপুর বারমুডা।

এবার প্রশ্ন আসবে, অপুটা কে? ঠিক আছে, উত্তর দিচ্ছি, অপু আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড। আর হ্যাঁ, অপু নামটা মোটেই আসল নয়, নকল লেখার একটা সুযোগ আমি ছাড়লাম না, কিন্তু এই একটিই। হ্যাঁ টা যা বলছিলাম, মানে ভাবছিলাম, বারমুডাটা সবুজ রঙের, উপরে গাড়ীর ছোপ ছোপ করা, বেশ পুরনো, সামনের দিকে একটা চেন আছে, আর অপুর যেটা হাঁটুর উপর অব্দি হোতো, সেটা আমার থ্রি-কোয়ার্টার হয়ে গেছে। হথাত মনে হল, আজকের ভাবনাটা এই বারমুডা নিয়ে লিখে দিব্যি চালিয়ে দেওয়া যায়। বেশ ভাবাও যাবে আর সঙ্গে লেখাও যাবে, আর অপু এবং তার বারমুডার ইতিহাসটা নেহাতই সাদামাটা নয়। হ্যাঁ, তাহলে এইবার ভাটের বকবক বন্ধ করে কিছু লেখা যাক।

ওকে, কীভাবে লিখবো? অ্যানা ফ্রাঙ্কের মতো বারমুডাকে চিঠি লেখা যেতে পারে, বা নেহাতই অপুকেই একটা চিঠি, শুরুটা হবে এইভাবে, “প্রিয় অপু, তুমি ভাবিতেই পারো নাই আমার হস্তে আবার এই পত্রখানা পাইবে, কিন্তু আজিকার দিবসে সকাল হইতে রোদ্দুর মাখিয়া, তোমার বারমুডা পরিয়া গায়ে হাতে পায়ে তেল মাখিয়া মনে হইতে ছিল এরকম সুন্দর একখানি সুন্দর দিবস তোমার সঙ্গেও কাটাইতে পারিতাম…”, মাফ করিবেন, মানে নিজেই নিজেকে করলাম আর কি, যা তা লেবেলের কাব্যি হয়ে যাচ্ছিলো, মানে বারমুডা পরে তেল মাথার কথা অব্দি তাও ঠিক ছিল, কিন্তু সেটা অপুকে সঙ্গে করে! এটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছিলো।

ঠিক আছে, আপাতত এটা বোঝা গেলো, বারমুডার আসল মালিককে চিঠি লেখা যাবে না, সোজাসুজি বারমুডাকেও চিঠি লেখাটা আমার অসামান্য লেখক প্রতিভার ক্ষমতার একশত কোটি ক্রোশ দূরে। তাহলে!

ইউরেকা, ইউরেকা…না, আমি এখুনি এই পোশাকে দৌড়ে গিয়ে বাথটবে নামতে যাচ্ছি না, কারনটা সিম্পেল, আহা কারনের দরকার নেই জানি, সবাই বারমুডা নিয়ে গল্প পড়তে বসে আমার ইউরেকার গল্প শুনতে চাইছ না, কিন্তু কিছু করার নেই, আমি বাপু স্বভাব লেখক, ভাবনার দাস বলতে পারো, একটু সব জিনিস নিয়ে না  ঠিক জমে না, আর না পড়তে ইচ্ছে করলে কেউ মাথার দিব্যি দেয়নি যে পড়তেই হবে, ভাগ বোকা ছেলে! (BC, এটার পরে একটা স্মাইলি দেওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল!)। আসলে তেল মাখার কথা ভাবা আর বাথটবে না যাওয়ার কারনটা সহজ, এখন শীতকাল, আর আমি দিব্যি দুতিনদিন তিন চারবার করে পারফিয়ুম লাগিয়ে গন্ধ স্নান করতে পারি।

ফেরত এসো বারমুডাতে, তোমাদের না আসলেও চলবে, আর সত্যি বলতে কি আমি ডাকিওনি, গল্পে ফেরত আসতে বললাম।

অপু আর আমি খুব ভালো বন্ধু ছিলাম, এতটাই ভালো যে আমরা একসাথে প্রচুর সময় কাটাতাম, ও আমার বাড়িতে বা আমি ওর বাড়িতে, সেই ক্লাস এইট থেকে, না না, অমলকান্তির গল্প লিখতে বসছি না, প্রমিস! আমাদের ইংরিজির টিচার ছিলেন ধিরেনবাবু, হ্যাঁ, তখন ডি. এম. এর মতো শর্ট বলতে শিখিনি, তো আমরা মোটামুটি একসাথে পড়তাম, একসাথে লিখতাম, একসাথে সময় সুযোগ হলে খেতাম, ক্লাস পালিয়ে গঙ্গার ধারেও গেছি, অবশ্য তখন কলেজে পড়ি। আমাদের বাড়ির লোকের ধারণা ছিল এরা প্রচণ্ড ভালো বন্ধু, আমরাও তাই জানতাম। আমাদের বন্ধুরা বলতো, তোদের তো আলাদা করাই যায়না রে! সত্যি বিন্দাস বন্ধু ছিলাম। আমার আর অপুর দুজনেরই দুটো সাইকেল ছিল, সেটা করে আমরা স্কুলে যেতাম, পড়তে যেতাম আর মাঝে মাঝে ইচ্ছে হলে গঙ্গার ধারে। সত্যি গঙ্গার ধারে যেতে আমার দারুন লাগতো, হয়তো এখনও লাগে। আমি পড়তাম টি শার্ট আর জিন্স, আর অপু ওর বিখ্যাত বারমুডা…সবুজ রঙের, গাড়ীর ছোপ ছোপ। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন মশাই, সেই বারমুডাটি, যেটি বর্তমানে আমি পড়ে আছি। সব থেকে মজার কথা, অপু ক্লাস সেভেন পর্যন্ত নাকি জাঙ্গিয়া পড়তো না, আহা কি সুখের জীবন ছিল ওর! আমাকে তো বোধহয় জন্মই দেওয়া হয়েছিলো ওইসব পড়িয়ে, থাক সেসব কথা, ভাওনাও মে বেহে জানা মেরি গন্দি আদত হে!

একবারের গল্প বলি, তখন আমি কলেজে পড়ি, সক্কাল সক্কাল অপুর ফোন, আজ কলেজ যাবো না, আজ যাবো গঙ্গার পাড়ে, একটা নাটকের গল্প বেশ মনে ধরেছে, কাল সারারাত ঘুমোইনি, ভিক্টোরিয়া জেগে যাবেন বলে তোকে বলা হয়নি, তুই আজ কালটি মেরে দে, চল আমার সঙ্গে, তোকে পুরোটা না বললে শান্তি হচ্ছেনা। আহা, ভিক্টোরিয়া আমি নই, আমার পরম শ্রধ্যেয় মাতৃদেবী, আর অপুর কথা মানে আমার কাছে আদেশ, অমান্য করলেই তিনি নিজে সক্কাল সক্কাল আমার বাড়িতে এসে হাজির হবেন নাটক শোনাতে, সেটা বেশ বিরক্তিকর ব্যাপার। অতএব…

আমি বেশ সেজেগুজে…হ্যাঁ আমি সাজতে ভালোবাসি, নীল রঙের জামার সাথে, পিঙ্ক রঙের নেলপালিশ সুতপা মেনেজ করতে পারে, আমি পারি না। তো যা বলছিলাম, আমি বেশ সেজেগুজে, যতটা কলেজের জন্যে করা যায় আর কি, হাজির হলাম সেক্সপিয়ারের আসরে, সকাল দশটা, আমি স্টেশন পেরিয়ে সাইকেল নিয়ে, পিছনের কেরিয়ারে ব্যাগ আটকে চলেছি গঙ্গার ধারে।

অপু আগেই পৌঁছে গেছিলো, আমাকে জীবনের চরমতম আশ্চর্য করে ওর বিখ্যাত সবুজ রঙের বারমুডা আর তার উপরে গাড়ীর ছোপ ছোপ বারমুডা পড়ে। জীবনে খুব কমই অবাক হয়েছি, যে কয়েকবার হয়েছি, তার মধ্যে এটা একটা! আমি বললাম, তুই এটা পড়ে কলেজ যেতিস? অম্লানবদনে জবাব এলো, এক্কেবারে খেয়াল করিনি গুরু, আজ বাবা আমায় পেদিয়ে পোদ্দার করে দেবে। দুর্ভাগ্যবশত, ওর পদবি পোদ্দার!

দুর্ভাগ্য কিন্তু অপুর সঙ্গ সঙ্গেই ছিল। আসা যাক সেই গল্পে, আহা ভাবনা তো একটা জ্যান্ত প্রাণী নাকি! সেও তো আমারই মতন চলতে ফিরতে পারে! আমার দাদার বিয়ে, অবধারিতভাবে অনিমন্ত্রিত কাঁঠালি কলা অপু। সে তার কাঁঠালি কলা সঙ্গে নিয়ে, আহা সত্যিকারের কলার কথাই বলছি, তিন দিন আগে থেকে আমার বাড়িতে। আমার দাদার প্রেম করে বিয়ে, সেটাকে লিখিত ভাষায় অন্য কিছু বলে কি না জানি না, অতএব আমি বউদিকে চিনি ভালো করে, সেও আমাকে চেনে, (বিয়ের পড়ে হাড়ে হাড়ে চেনার কথা! সেটা তিনি ভালো করেই চিনেছেন আশা করি!), আর আমার সঙ্গে আমার স্যাঙ্গাৎ অপুকেও চেনেন।

তিনদিন আগে থেকে আমার বাড়িতে অপু এসে গেলেন দু-কাঁদি কাঁঠালি কলা নিয়ে, কাজের সময় খেতে ভুলে গেলে সবাই কলা দিয়ে যেন ম্যানেজ করতে পারে! অদ্ভুত লজিক। আমার বিজ্ঞ বিজ্ঞ দাদাটি এইসব দেখে এই মারে কি সেই মারে! সে আর কিছু করার নেই, আমার অপু, আমারই দোসর…তাহার বুদ্ধি, চিন্তা ভাবনা বৃহস্পতি গ্রহ থেকে আসিলেও সেটাকে সমর্থন করা আমার আমাশা হওয়ার পরে পটি যাওয়ার থেকেও বেশি দরকারি। অবশ্য মা কিন্তু দারুন আনন্দ পেয়েছিল। আমার কথা ছেড়েই দিলাম! টবে সমস্যাটা ছিল অন্য, কুকুরছানা যেমন তাহার মাতৃদেবী ছাড়া বাঁচে না, যেমতি ব্যাঙ্গাচি জল ছাড়া মৃত, তেমতি, একঘর লোকের সামনে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, গত এগারোটি বছর ধরিয়া (ঠিক আছে, ধরলাম বারমুডাটি’র বয়স চার, তাহলেও…!) তাহার ট্রেডমার্ক সবুজ রঙের বারমুডা আর তার উপরে গাড়ীর ছোপ ছোপ নিয়ে এক্কেবারে বিন্দাস এখানে ফুল লাগানো, ওখানে মাসতুতো দিদিকে নিয়ে পার্লারে নিয়ে যাওয়া, পিসতুতো দাদার ছেলেকে নিয়ে সার্কাসের ক্লাউন হয়া…সব করে গেলো।

আমার একটাই ভয় ছিল, সন্ধ্যেবেলা যেন যা তা, মানে ওই বারমুডাটা পরে না চলে আসে! আসেনি…সন্ধ্যেবেলা, আমি যখন মোটামুটি তিনটে লেয়ারের মেকাপ লাগিয়ে আমার নাভি বের করা লেহেঙ্গাতে তৈরি, সারারাত ব্যয় করে সত্যিকরে ঘুমিয়েছি, যাতে চোখের নীচে একটুও কালো না লাগে, অবশ্য তার আগে মাঝরাত অব্দি সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেচেছি, অপুর গ্লাস থেকে একটুখানি মালও খেয়েছি, (সেটা অবশ্যই সবার ঘুমনোর পরে), অপু এলো, আমারই পছন্দ করে দেওয়া সোদপুরের পাঞ্জাবী বাজার থেকে কিনিয়ে দেওয়া ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবী, আর গাড় মেরুন রঙের কাজ করা লাল রঙের ধূতি পড়ে…সত্যি সেদিন আমি জীবনে প্রথমবার ওকে ভালোবেসে ফেলি…!!! আমি ক্ষমা চাইছি, এভাবে সবাইকে বলে ফেলার জন্যে। কিন্তু ভালবাসাটা বেড়ে গেছিলো, সেদিন ওকে আবিষ্কার করার পরে, যখন জানতে পেরেছিলাম… সেদিনও ধুতির নীচে ওর সেই সবুজ বারমুডাটা ছিল, গাড়ীর ছোপ ছোপ…

ও হ্যাঁ, অনেক রাত হল, আমি আর ভাবতে পারছি না… যেটা বলা হয়নি, সেটা হল, আমি সিগারেটের সাথে রাম খাচ্ছিলাম, এটা আপনারা কতটা ভাবতে পারেন জানিনা, বাবা-মা না থাকলে আমি বাড়িতেই আমি খাই! আর আমি খাবো আমার স্বামী সঙ্গে থাকলেও। সে আর আমার বয়ফ্রেন্ড আর নেই, কাল বিয়ে আমার… শুভেচ্ছা দরকার খুব একটা নেই, এগারোটা বছর খুব কম নয়, বাকিটা দেখা যাক…!!!

সৌগত

09.01.2017

ও নিজেই গল্প করে ব্যাবসা চলছে মোটামুটি ভালই, আস্তে আস্তে মার্কেট বাড়ছে, লোকে চিনছে ওর প্রোডাক্ট, ভালো ভালো কমিশন রাখছে সেলারদের জন্যে। শুরু থেকে মানুষ কিছুই শিখে আসে না, তাকে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে জানতে হয়, বুঝতে হয় সব কিছু, তখন পদে পদে তাকে গাইড করার জন্যে লোক থাকে, কখনও বাবা মা, কখনও অন্য বড়রা। আগে একান্নবর্তী পরিবারের যুগে বাচ্চারা খুব ছোটবেলা থেকে কথা বলতে শিখে যেত, এখন ঘর ছোট হয়েছে, বাগান শেষ হয়েছে, বাবা মায়ের ব্যাস্ততার মাঝে অবসর কম, বাচ্চারা শিশু থেকে হটাত বালক হয়, তারপর হটাত করেই একদিন কেমন বড় হয়ে যায়।

কি করছিস ভাই ছাদে দাঁড়িয়ে, তারা গুনছিস নাকি? মস্করা করলো নন্তু। নন্তু অবশ্য এইদশাটা জানে অর্কর। অর্কর এরকম স্বভাব আছে, মাঝে মাঝেই নিজেতে হারিয়ে যায়, কোন অদ্ভুত কিছু নিয়ে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পরে।

নন্তু এক কথা বল, ছোটবেলায় যখন পরীক্ষার খাতা বের হতো বাড়িতে দেখানোর জন্যে, কেমন লাগত তখন?

নন্তু ঘুরল, তাকাল আকাশের দিকে, তারপরে আস্তে করে বলল, ঠিক ওই আকাশের মত, মনে হত খারাপ পরীক্ষা দিয়েছি তো জানতামই, শুধু শুধু বাবা-মা’র কাছে বেইজ্জত করার কি দরকার বাপু!

অর্ক হেসে ফেলল, নন্তু কোন কালেই ভালো নাম্বার পাওয়াদের দলে ছিল না, ওর বাড়ি থেকেও সেরকম কোনও চাপ ছিল না, খারাপ নাম্বার পাওয়ার পরে ওর বাবা-মা কে কখনো মুখ লুকোনোর দরকার পড়েনি, যেমনটা ওর বাড়িতে হতো, খারাপ নাম্বারের থেকেও বড় ছিল পাড়াতেই অন্য আরেকটি মেধাবী ছেলের বেশি নাম্বার পাওয়া, অর্ক চেষ্টা করতো না, তা নয়, কিন্তু সেই ছেলেটা আরও বেশি চেষ্টা করতো, আরও বেশি নাম্বার পেত, ফল হতো এইযে বাবা অফিস থেকে ফেরার পরে কখনও খুব করে ঝাড় পড়তো, কখনও মন খারাপ করে মা একবেলা খাওয়া ছেড়ে দিতেন। এই ফ্রাস্তেসানটা কখনও যায়নি অর্কর। একসাথে বিকেলে খেলতে যাওয়া, তারপরে আবার পরের দিন সকালে এক থালা ভাত খেয়ে স্কুলে যাওয়ার মধ্যেও কোথাও একটা সেই হীনমন্যতা কাজ করতো সারাক্ষণ। মনে হতো বাবা মা এতো কষ্ট করে বড় করছেন, কিন্তু সে তার কোনও প্রতিদান দিতে পারছে না, চেষ্টা করেও। নন্তুর সেইসব চাপ ছিল না, খাতা বেরোনোর পরেও বিন্দাস বিকেলেবেলা ডাকতে চলে আসতো খেলার মাঠে যাওয়ার জন্যে।

এখন বেসরকারি অফিসে চাকরি করা, হাজারটা ঝামেলা, যন্ত্রণা, মীটিং, কর্পোরেট পলিটিক্সের মাঝে যে দুদণ্ড সময় নিজের জন্যে বাঁচে, সেই সময় ভাবতে ইচ্ছে করে, ছোটবেলাটা তার খারাপ ছিল না, বেশ আনন্দেরই ছিল, শুধু ওই প্রতিযোগিতার গরম নিশ্বাসটা এখনও মাঝে মাঝে রাতের ঘুম নিয়ে খেলা করে, খারাপ নাম্বার পাওয়াটা ততটা দুঃখ দেয় না, যতটা দেয় সেইসময়ের মানসিক যন্ত্রণাটা। আজ আপাতসফল জীবনের মাঝেও সেইদিনের ক্ষতগুলো ভুলতে পারে না সে, ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকলে, সে শুধু পড়াশুনা করতো, কোনও প্রতিযোগিতায় না জিতে, জেতার চেষ্টাও না করে।

Kabir immediately picked up the mobile and typed a text message, ‘hope you are safe and nothing happened due to that horrible incident in Kolkata’…then a long pause, holding the send button! He was not sure whether to send the message or not? He broke up with Manasi long four years back and since then they never exchanged any word except once, when he sent a message in Facebook, that also after long 3years of that break up. Nope, that experience was not good though. Kabir wrote a few lines in Facebook messenger and finally after one or two days later, got a very strong reply disguised in instruction that, ‘don’t message me or disturb me’.

Kabir still couldn’t remember what actually happened to him, he knew that he will get such kind of reply but still he tried, he even said sorry too though he still doesn’t have any idea of why he would have to say sorry? He didn’t broke up with Manasi, neither Manasi also broke up with him. There were a few tensions, misunderstandings, family drama and conflict of interest, things didn’t go well and so they ended up with a break up. Break up means they stopped being with each other, spending time together or even stopped being in talking terms. It’s like, suddenly a kind of decision and then forgetting whatever good times they had spent once. Kabir sometime wonder, what kind of relationship was that? Though he was the one who pointed out the negative things of that relationship first, still he never knew that their relationship doesn’t deserve a little bit respect when it is over, even then when he himself didn’t mind to say sorry, number of times.

Anyway, a flyover collapsed on Vivekananda Road. The first thing came in Kabir’s mind was simple, Manasi used to stay near there. She used to take that route while going for her tuition or while returning from there. After fighting a lot with his own conscience, he finally took the mobile and typed a message and was in confusion, whether to send or not. He was really worried but he couldn’t do anything. He couldn’t even ask, or send a text message. Actually he was well aware that he will not get any reply, even if he gets, it would not be a nice one.

When did heart listened to brain? Finally Kabir pressed the send button, “hope nothing happened to you in that mishap. I will be really grateful if you could reply with atleast a letter” and then eternal wait. No reply came in next five minutes, not even in ten minutes. Kabir was in a meeting with his CEO and he was the one who was giving the power-point presentation. People from investors, bankers were very much curious about his presentation. He was also very much in to that, until the reply came, a small vibration in pocket, he took out the phone, Manasi replied, “it is very much annoying to receive a message from you. It will be really helpful if you could stop sending me messages or any other way to communicate with me. I am married and let me be happy in my life”. Kabir read the whole thing, the way Manasi replied was not good in anyway but he was happy. Kabir didn’t ask for any favour, he didn’t even requested Manasi to keep in touch or again fall in love with him. He actually didn’t ask for anything. He was just curious, he was panicked and then he was happy to know nothing happened to Manasi. Kabir himself is a married person, so there was no point getting upset knowing Manasi also got married.

Kabir typed a reply, everybody in the meeting room was looking at him, waiting for him to continue with the presentation, but Kabir was busy with the keyboard of mobile, he typed thrice, deleted twice and finally replied, “Thanks….Be happy” and turned his head towards the presentation.

 

Kabir

31.03.2016

Gurgaon

বাড়িতে এলে অর্কর ঘুমের সময় বেড়ে যায়, কখনও দশটাতেও চেঁচিয়ে ঘুম ভাঙাতে হয় ওর আর এই কাজে অনুর জুড়ি নেই। অনু অর্কর বোন, তিন বছরের ছোট। কলকাতার ধর্মতলাতে একটা বেসরকারি অফিসে চাকরি করে আর সন্ধ্যেবেলা বানী সঙ্ঘে ফ্রি কোচিং সেন্টারে পড়ায় গরিব ছেলেপুলেদের। ছোটবেলা থেকেই অনুর সঙ্গে ওর ঠিক ভাইবোনের সম্পর্ক নয়, কেবল বকাঝকার সময় অর্ককে একটু দাদা সাজতে হয়, বাকি সময় নিজেরা বন্ধুর মতই মেশে, আর বয়েসের পার্থক্য কম হওয়ায় সুবিধে আরও বেশি। একটু বেশি বেলা পর্যন্ত ঘুমোলে অনুই আসে ধাক্কা দিয়ে তুলতে, আর তখন টেবিলের উপর এক কাপ চা রেখে যায়। অনু এখনও চা ছাড়া রান্না বান্না বিশেষ কিছু জানে না, শেখার চেষ্টাও নেই, মা অনেকবার চীৎকার চেঁচামেচি করে শেষে ছাড়ান দিয়েছেন কিছুদিনের জন্যে। আজ বেস্পতিবার, দুপুরে সুপ্রতিমের সঙ্গে দেখা করার কথা আছে, পানিহাটির ঘাটে, দুপুরবেলা। সুপ্রতিম ছোটবেলার বন্ধু, এখন সরকারি চাকরি করে। কলকাতায় আসার আগে থেকেই কথা হয়েছিলো। এমনিতে বাড়িতে আজ নিরামিশ রান্না, বাবা সক্কাল সক্কাল ভাত খেয়ে অফিসে, অনুও বেরোবে আর একটু পরেই, তারপরে সারাটা দিন বড্ড বোরিং। ঘরে থাকলে সিগারেট খাওয়া যায় না, পড়ে পড়ে ঘুমনো যায়না, খালি টিভি দেখা, কখনও কোনও বন্ধুর সময় খালি থাকলে তার সঙ্গে দেখা করা আর সন্ধ্যে হলে অনু ফেরার পরে ছাদে গিয়ে আড্ডা। আসলে সব বন্ধুরাই কেমন ব্যাস্ত হয়ে গেছে, কেউ থাকে বিদেশে, কেউ বা তারই মত অনেকদূরে, মাঝে মাঝে বাড়ি এসে জানান দিয়ে যায় বেঁচে আছি মা। খুব খারাপ লাগে কার সঙ্গে দেখা করার কথা ঠিক হয়ে যাওয়ার পরে হয়ত তার ফোন এলো আর বলল, ভাই কিছু মনে করিস না, আজ না হবে না। সে বোঝে না এই একটু মাত্র বেরোনো কেবল দেখা করার জন্যে নয়, এটা তার কাছে সিগারেট খাওয়ার চাবিকাঠি, এটা তার কাছে তার পুরনো শহরকে আরেকবার আরেকটু নতুন করে দেখার সুযোগ।

অর্ণবদাদের বাড়িটা সেই কোনকাল থেকেই লালরঙের, ওরা প্রতিবছর বাড়ির রঙ করাতো, কিন্তু কখনও রঙ বদলায়নি। মোড়ের মাথা থেকে একটা রিকশা নিলো অর্ক, অল্পসল্প সাহেব হয়ে গেছে ও, গরম রোদে হাঁটতে ইচ্ছে করলো না তাই।

কিছু লোকের চেহারা কখনও বদলায়না, সুপ্রতিমেরও সেরকম, সেই আগের মতই সামনের দিকে টুপি বানানো চুল, ঠোঁটের কোণে সবসময় একটা হাসি আর চোখে মুখে বাচ্চাদের সারল্য। মহাপ্রভু ঘাটের পাশের অশ্বত্থ গাছের তলায় বসল দুজন। এখনও ঠাণ্ডা ঠিক করে পড়েনি, কিন্তু দুপুরের পর থেকে সময়টা যখন বিকেলের দিকে গড়ায়, তখন গঙ্গানদীর উপরে কেমন একটা ধোঁয়াশার আস্তরণ পরে। অর্কর ভারি ভালো লাগে এইসময়টা। কেমন একটা শান্ত হয়ে ওঠে চারপাশটা, যেন একটা ছোট্ট বিরতি, তারপরেই আবার গা ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠবে সব কিছু।

কথা বলতে বলতে কখন সময়টা কেটে গেলো, বোঝাই গেলো না, কখন সেই আড্ডার মাঝে তিন কাপ চা উড়ে গেছে, কখন একটা গোটা গোল্ড ফ্লেকের প্যাকেট শেষ হয়ে গেছে, খেয়াল করেনি কেউ। আড্ডার মাঝে ব্যাবসা উঠেছে অনেকবার, চাকরির কথা এসেছে, কখনও বা উঠে এসেছে দীপ্তি। যেমন ভাবে একটা দিনের ছায়া লম্বা হয়, যেভাবে ছোটো ছোটো পা ফেলতে ফেলতে একদিন একটা বাচ্চা হাঁটতে শুরু করে, যেভাবে একটার পর একটা ইট গেঁথে তৈরি হয় বাড়ী, সেভাবে অনেক অনেক ঘটনা, স্মৃতি, আনন্দ ভালবাসা মিশে তৈরি হয় একটা সম্পর্ক, কখনো তাকে আমরা বলি বন্ধুত্ব, কখনো বলি দাম্পত্য, কখনো বলি ভাইবোনের খুনসুটি।

ছাদের উপর বসেছিল ওরা, ওরা মানে অর্ক আর অনু। অনুর অফিস থেকে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে যায়, কখনও রাতও হয়। অর্ক অপেক্ষা করে থাকে এই সময়টার, অনু এলে ওরা ছাদে চলে আসে, তারপর ঘণ্টাখানেক গল্প আর আড্ডা। আচ্ছা দাদা, সুপ্রতিমদা এখন কি করছে রে? অনু জিজ্ঞাসা করল অর্ক কে। এই একটা প্রশ্নের উত্তর এতক্ষন থেকেও ঠিক বুঝতে পারেনি অর্ক, কেমন একটা ভাসা ভাসা উত্তর এসেছে, কখনও কথা শুনে মনে হয়েছে স্কুলের ছেলেমেয়ে পড়ায়, কখনও মনে হয়েছে থিয়েটার করে, কখনও মনে হয়েছে ব্যাবসা। অর্ক খেয়াল করেছিল কাজের কথা বললেই কেমন একটু পাশ কাটাচ্ছিল যেন সুপ্রতিম। ও পুরোটাই খোলসা করে বলল অনু কে, অর্ক দেখেছে, কিছু জিনিসে অনুর মাথা খোলে ভাল।  সব শোনার পরে অনুও ঠিক বুঝতে পারল না।

একটা সময় ছিল যখন ওদের বাড়ির ছাদ থেকে এয়ারপোর্ট এর আলো দেখা যেত। তারপর কত বড় বড় বাড়ী হল, রাস্তায় লোক বাড়ল, দূষণ দখল করে নিলো খোলা আকাশটা। আজকাল মানুষের কথাবার্তাও কেমন যেন পাল্টে গেছে, মানুষ আর আজকাল তর্ক করে না, হয় গুগল দেখে মিটমাট করে নেয়, অথবা একটু কথাবার্তার পরেই সটান জামার কলার ধরে টান দেয়। টানা পঁয়ত্রিশ বছরের বামশাসন শেষে মানুষ একটা কথা বুঝতে শিখেছিল, কোনও কিছুই চিরন্তন নয়। নিচের ঘর থেকে মায়ের গলার আওয়াজ শুনতে পেল অর্ক। নন্তু এসেছে। নন্তু অর্কর পাড়ার বন্ধু। মফস্বলের পাড়া, বন্ধুত্ব ছোটবেলা থেকে হয়। নন্তু ব্যাবসা শুরু করেছে, ছোটো একটা কারখানা খুলেছে মোমবাতি, ধুপ এইসবের।

কলকাতা শহরটা এই শেষ দশ বছরে অনেকটা বেড়েছে, উত্তরদিকের বৃদ্ধিটা একটু বেশিই। আগে লোকে ব্যারাকপুরকে কলকাতা ভাবত না, এখন আলাদা ভাবে না, বরানগরকে পর্যন্ত ভাবা হতোনা কলকাতার মধ্যে, এখন ভাবা হয়। যদিও ওটা কর্পোরেশনের এলাকার মধ্যে পড়ে না, কিন্তু তাহলেও আজকাল সেখানে মল হয়েছে, রাস্তা বড় হয়েছে, ফ্লাইওভার আর রাতের আলো দেখে বোঝা মুশকিল একটা সময় ডানলপ ব্রিজের নিচ দিয়ে লোকে যেতে ভয় পেতো, এতটাই ট্রাফিক জ্যাম হত সেখানে। এখন উপর দিয়ে বম্বে রোড গেছে আর নিচে ঝাঁ চকচকে কালো পিচের রাস্তা। একটার পর একটা বড় বড় দোকান আর ইলেকট্রিকাল জিনিসের দোকান। ওই রাস্তা ধরে আরও একটু এগিয়ে গেলে দুধারে চোখে পড়বে ধীরে ধীরে সেই মান্ধাতা আমলের বেশবাস ছেড়ে শহরও বেশ পাল্লা দিয়ে সেজে উঠেছে। হলদে রঙের ট্যাক্সিগুলো আগে বরানগরই আসতে চাইতো না, এখন দিব্যি ব্যারাকপুর অব্দি চলে আসে। দুধারে সদর্পে বেড়ে উঠেছে বহুতল অট্টালিকা আর তার মাঝে ঝুপ করে একটা বহু পুরনো সভ্যতা কেমন যেন হটাৎ করে বড় হয়ে গেছে।

ক্লাস এইটে পড়ার সময় যেমন হটাৎ করে ছোট ছোট ছেলেগুলো লম্বা হয়ে যায় আর তারপরে হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট পরে নেয়, ঠিক তেমন করে শহরটা গায়ে গতরে বেড়েছে, একটু আধটু জেল্লা বাড়িয়েছে সময়ের সাথে সাথে। খড়দা পেরলে একটা সিনেমা হল পড়ত, প্রফুল্ল নামে, সে কবেই বন্ধ হয়ে গেছে, এখন বেশ কিছু মাল্টিপ্লেক্স হয়েছে, সকালে বিকেলে আলাদা আলাদা টিকেট, আলাদা আলাদা সিনেমা, ভেতরে আর বেঞ্চ পেতে দেখতে হয় না, সকালবেলা নীল সিনেমা চলে না, এখন এসি চলে, টিকিটের দাম একটু বেশি ঠিকই কিন্তু কেনার ক্ষমতাও তো অনেক বেড়েছে।

অর্ক আজ শহরে ফিরছে প্রায় দেড় বছর পরে। শহরের ছোঁয়ালাগা শহরতলীর স্কুল পেরিয়ে, সময়ের দাবি মেনে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশুনা করে আজ একটা বেসরকারি জায়গায় কাজ করছে বছর পাঁচেক হল। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, রাস্তা ঘাট, ব্রিজ বানানো তার কাজ, সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে কম্পানির গাড়ীতে চড়ে দশ কিলোমিটার যেতে হয়, তারপর সারাদিন শ্রমিকদের সঙ্গে মাথা খাটিয়ে, শরীরের সব ঘাম ঝরানোর পরে সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফেরা। বাড়ি বলতে কম্পানী যেখানে যেখানে রেখেছে।

মাঝের অনেককটা দিন বাড়ি আসার সুযোগ হচ্ছিলো না, আর তার বাবা মা’ও মাঝে ছোট করে ওর ওখানে ঘুরে গেছিলেন, তাই আর আসার তেমন দরকারও ছিল না। দীপ্তির সঙ্গে সম্পর্কটাও তো টিকলো না, তাই বাড়ি ফেরার তেমন আগ্রহ খুজে পায়নি অর্ক। কিন্তু এই কয়েকটা মাত্র দিনের মধ্যে শহরটাকে এভাবে বদলে যেতে দেখবে, ভাবতে পারেনি ও। প্রচুর আকাশছোঁয়া বাড়ি, শহুরে সিগন্যালের মধ্যে নিজেকে কেমন একটু একা একা মনে হচ্ছিলো। হাওড়া স্টেশনে ট্যাক্সির চীৎকার শুনে একবারও বুঝতে পারেনি এরকম একটা অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে তাকে। বড় বড় বাড়ির মাঝে একটাও খেলার মাঠ দেখতে পেলনা ও, বেশ কিছু নতুন স্কুল দেখতে পেল, কেমন যেন পাঁচিল দিয়ে শুরু আর পাঁচিল দিয়েই শেষ। বাইরে প্রচুর বাস দাঁড়িয়ে। ও যে সরকারি স্কুলে পড়তো, সেখানে বাস ছিল না, কিন্তু ছিল একটা প্রকাণ্ড খেলার মাঠ। চারদিকে গাছ দিয়ে ঘেরা। টিচাররা বেশ একটা গম্ভীর মুখ নিয়ে আসতেন পড়াতে, কখনও মারতেন বেত দিয়ে, কখনও আদর করে গাল টিপে দিতেন। রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে পা ছুঁয়ে প্রনাম করতে হত, বাবা মা শিখিয়েছেন, সবাই অপেক্ষা করতো কখন টিফিন টাইম হবে আর পিংপং বল দিয়ে খেলা হবে পিটটু। দোতলার বারান্দা থেকে উঁচু ক্লাসের দিদিরা তাকিয়ে থাকবে আর হাফপ্যান্ট পরা কচি বয়সের ধেড়ে পাকা ছেলেগুলো ভাববে, তারা কবে বড় হবে। এখনকার এই হলদে রঙের বাস থাকা স্কুলে কি এখনও এইসব হয়? এখনও কি তারা অগ্নি জেল পেন কিনে ভাবে কি দারুন একটা জিনিস! বা নটরাজ পেন্সিলের মাথা চিবিয়ে ভাবে যে দারুন খেতে! ওদের স্কুলে কি চাপকল আছে বা বাহাদুর দারোয়ান? অর্কর একটু ভয় পেল, এমন নয়তো যে স্কুলে ভর্তি হয়ে সময় নিয়ে বড় হওয়ার আগেই এরা বড় হয়ে যায়! সেই হলদে পাতা, লুকিয়ে পড়া বই পড়ার আগেই এরা সবকিছু জেনে ফেলে না তো! বেশিদিন নয়, মাত্র দশ বছর আগেই এরকম একটা স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বোকার মত তাকিয়ে থাকতো ও দীপ্তির দিকে। নিজের ক্লাস শেষ হলেই কোনও একটা অছিলায় বাইরে বেরিয়ে আসতো এই আশায় যে হয়ত দীপ্তিও বেরোবে, কখনও কখনও সেটা মিলেও যেত, আবার কখনও সকাল গড়িয়ে বিকেল হতো, সন্ধ্যে নামত পশ্চিমের আকাশে, কিন্তু দেখা মিলত না। অর্কর আর ভাবতে ইচ্ছে করছিলো না। ঠাকুর কর্নারের পাশের রাস্তা দিয়ে ট্যাক্সিটা ঘুরিয়ে ড্রাইভার মাথা ঘোরালো, জানতে চাইল কোন দিক দিয়ে যেতে হবে…

চলবে…

এরকম কিছু হলে কি হয়েছে, সেটা বলার দরকার পরে না। এখানে মাঝে মাঝেই পুলিশের ছোবল পড়ে, কখনও সত্যি লোক ধরা পড়ে আর কখনও যেকোনো লোক ধরা পরলেই চলে। রাতেরবেলা দৌড়াদৌড়ির শব্দ শোনা যায়, আর তার একটু পরে গ্রামের লোকের আওয়াজ আর রাস্তায় পড়ে থাকা একটা বা দুটো ডেডবডি। কখনও পুলিশের বডিও পড়ে থাকে, কিন্তু তখন শুরু হয় অত্যাচার, সব কটা ঘর খুঁজে দেখে, খাটের নীচ, গাছের ঝাড়, মড়াই কিছু বাদ থাকে না, কখনও তার মাঝেই এর ওর গায়ে একটু হাত দিয়ে মজা করে নেয় সরকারি কুত্তাগুলো। কিছু বললেই পুরে দেবে সীসার টুকরো আর ঘোষণা করে দেবে মাওবাদী বা দেশদ্রোহী। বিতান পরিস্কার বুঝতে পারলো তার ঘরের দিকেই আসছে আওয়াজটা, সে হাত দিয়ে ইশারা করে চুপ করতে বলল উত্তমকে, তারপর চুপ করে বসে থাকল। একটু পরে দুমদাম দরজায় আওয়াজ হল, সে ঘুম জড়ানো গলায় দরজা খুলে দিলো। তিনটে পুলিশ দাঁড়িয়েছিল বাইরে, একজনকে সে চেনে, আগেও দেখেছে এই গ্রামে, সেই প্রথম মুখ খুলল, উত্তমকে এদিকেই আসতে দেখলাম, তোর ঘরে নেইতো? বিতান বুঝল, সে পার্টি করে বলে এত ভদ্রতা দেখাচ্ছে, আসলে সব কটা শয়তানের গাছ, অন্য লোক হলে এতক্ষনে তার ঘরে ঢুকে নিজেরাই সব খুঁজে উপরন্তু পাশের ঘরে বউদির গায়েও হাত দিয়ে আসতো শালারা। সে মুখে কিছু প্রকাশ করলো না, মুখে বলল, এসেছিল একটু আগেই, জায়গা চেয়েছিল, বলেছিল পিছনে পুলিশ, কিন্তু সে জায়গা না দেওয়ায় বাঁদিকের রাস্তা ধরে দৌড়ে গেছে। এর বেশি আর কিছু জানে না সে। পুলিশগুলো চোখ ছোট ছোট করে এইসব শুনল, তারপরে কথা না বাড়িয়ে হাঁটা দিলো বা দিকের রাস্তা ধরে। বিতান আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো ওদের দিকে তাকিয়ে। বিশ্বাস নেই এই শুয়োরগুলোকে, কখন আবার ফেরত আসে সন্দেহ করে।

সারারাত আর ঘুম হয়নি তার, উত্তম পা ধরে প্রনাম করেছিলো, সে একটা লাথ মেরে বলেছিল, শালা তুই যে নকশাল, সে কথা বলিসনি তো! আমি জানতাম তুই সিপিএম করিস, তারপরে বুঝলাম তোদের পার্টিই বন্ধ হয়ে গেছে বলে এমনি ঘুরে বেরাস আর তুই শালা জঙ্গলের ডাকাত? সকাল হলেই ভাগবি, ভোরের বেলা, আর কেউ যদি দেখে তো ওখানেই একটা গুলি খেয়ে মরে যাস। আর কোনও কথা হয়নি।

সকালবেলা সাহেবের ওখানে যাওয়ার ছিল, মনোহরদা বলে রেখেছিলেন। সকালেবেলাতে আক্রা নদী খুব সুন্দর দেখায়, কেমন একটা তিরতিরে হাওয়া বয় আর বেশ কোমল একটা গন্ধ আসে নাকে। পলাইকে বলা ছিল কাল রাতের বেলা সাহেবকে মেয়ে সাপ্লাই করার কথা। পলাই নিশ্চয় করেছে, ওর কথার দাম আছে। এই গ্রামেও কোথা থেকে মেয়ে যোগাড় করে কে জানে! একবার একটা মেয়ে কে দেখেছিল বিতান, কালো গায়ের রঙ, ভরাট পিছনটা আর বুকের কাছটা, দেখলেই কেমন একটা মোচড় দিয়ে ওঠে বুকটা, মনোহরদা বলেছেন সব ভালো, মেয়েমানুষের পাল্লায় পড়া ভালো না, তাই বিতান একবার দেখেই চোখ সরিয়ে নিয়েছিল, তারপরে একবার আড়চোখে তাকিয়েওছিল, কিন্তু তখন মেয়েটাও ওর দিকে তাকিয়ে সব গোলমাল করে দিলো আর মনোহরদা দেখে ফেলে কটা কাঁচা খিস্তি মারলেন।

সাহেবের বাড়ির গেট খোলা, কাউকে জিজ্ঞাসা না করেই সে ভিতরে ঢুকে গেলো, ইটের রাস্তা পেরিয়ে বাড়িতে ঢোকার মুখেই গলার আওয়াজ শুনতে পেলো মনোহরদা’র। তারপরে দেখতে পেলো দুজনকেই, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। একটু ইতস্তত করে ওখানেই দাঁড়িয়ে গেলো বিতান। বেশ গলা চড়িয়ে কথা বলছিলেন মনোহরদা, সাহেবও মুখেমুখে জবাব দিচ্ছিলেন আধা হিন্দি, আধা ইংরিজিতে, বেশ বুঝতে পারছিলো যে ওদের মধ্যে একটা কিছু নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে। সে বাইরেই অপেক্ষা করতে থাকলো।

এখনও পুরোপুরি বর্ষাকাল আসেনি, বর্ষা এলে এইসব রাস্তায় আর হাঁটা যায় না, অল্পস্বল্প যেসব জমিজমা আছে, তাতেই চাষ আবাদ শুরু হয়ে যায়, আক্রা নদীতে জল বাড়লে রাত জাগে গ্রাম, কখন ঘর ছেড়ে উঠতে হয় স্কুল বাড়িতে! পূবদিকে একটা আমগাছে চোখ গেলো, বাঁজা আমগাছ, ফল নেই একটাও, আমগাছের নীচে একটা বেশ বড় উইপোকার ঢিপি, একটু ভাল করে বৃষ্টি হলেই এইসব ঢুকে যাবে মাটির তলায়। বিতান ভেবে পেলো না যে তখন উইপোকাগুলো বেঁচে থাকবে কি করে? যদিও উইপোকার থাকা বা না থাকার উপরে তার খুব একটা আগ্রহ নেই, তবু কেন মাথায় এল তার? এরকম হচ্ছে আজকাল, কিছু ভাবার আগেই একতাল চিন্তা এসে সব ওলটপালট করে দিচ্ছে। এমনিতেই তার মাথায় বুদ্ধি কম, গ্রামে আছে, ঘরের খাচ্ছে বলে চলে যাচ্ছে, বাইরে বেরোতে হলেই ‘হু হু বাওয়া’ হয়ে যাবে। সে মাঝে মাঝে অবাক হয়, ওদের গ্রামেরই লোক হয়ে মনোহরদা’র এতো কি করে বুদ্ধি! নিজের একটা দোকান আছে মোহম্মদবাজারে, সেটা নাকি বেশ ভালই চলে, বিয়ে করেনি আর এদিকে রাজনীতি করে বেশ নিজেরটা ভাল করে গুছিয়ে নিচ্ছে। আজকাল গ্রামের বয়স্ক লোকেরাও ওর কাছেই আসে শলাপরামর্শ করতে আর মনোহর’দাও বেশ গুছিয়ে জবাব দেন।

এরকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই আমগাছের পিছনের দিকটায় পৌঁছে গেছিলো বিতান। ডানদিকে, যেদিকে কলুখোলার মাঠটা আছে, সেদিকের ডালে একটা পাখির বাসা দেখতে পেলো সে, কোনও আওয়াজ না করে চুপচাপ সেদিকে এগিয়ে গেলো সে আর তক্ষুনি একটা দ্রুম করে শব্দ হল, ছিটকে বেরিয়ে এলো সে, বেশ কিছু পাখি, যারা কোনও গাছের ডালে বসেছিল, উড়ে গেলো আওয়াজ করে। বিতান দৌড়াতে শুরু করলো বাংলোর গেটের দিকে, কিছু একটা ভয়ানক হয়েছে সে বুঝতে পারছিল। সাহেবের ঘরের দিকে তাকাতেই সব পরিষ্কার হল, একটা চেয়ারের উপর উবুড় হয়ে পড়েছিল সাহেব, বলা ভালো সাহেবের ভারিক্কি চেহারাটা, আর অদ্ভুত শান্ত মুখ নিয়ে সামনেই দাঁড়ানো মনোহরদা। কাঠের দরজার একপাশ দিয়ে পাতলা একটা রক্তের ধারা তাজা স্রোত হয়ে বয়ে চলেছে। বিতান চীৎকার করে উঠলো, “মনোহর দা!”

চলবে…