বদলে গেছো তুমি, আমিও ৮

Posted: August 7, 2015 in Bengali, birbhum, Community, life, maoist, nakshal, Peace, Personal, Social
Tags: , , , ,

বাড়িতে এলে অর্কর ঘুমের সময় বেড়ে যায়, কখনও দশটাতেও চেঁচিয়ে ঘুম ভাঙাতে হয় ওর আর এই কাজে অনুর জুড়ি নেই। অনু অর্কর বোন, তিন বছরের ছোট। কলকাতার ধর্মতলাতে একটা বেসরকারি অফিসে চাকরি করে আর সন্ধ্যেবেলা বানী সঙ্ঘে ফ্রি কোচিং সেন্টারে পড়ায় গরিব ছেলেপুলেদের। ছোটবেলা থেকেই অনুর সঙ্গে ওর ঠিক ভাইবোনের সম্পর্ক নয়, কেবল বকাঝকার সময় অর্ককে একটু দাদা সাজতে হয়, বাকি সময় নিজেরা বন্ধুর মতই মেশে, আর বয়েসের পার্থক্য কম হওয়ায় সুবিধে আরও বেশি। একটু বেশি বেলা পর্যন্ত ঘুমোলে অনুই আসে ধাক্কা দিয়ে তুলতে, আর তখন টেবিলের উপর এক কাপ চা রেখে যায়। অনু এখনও চা ছাড়া রান্না বান্না বিশেষ কিছু জানে না, শেখার চেষ্টাও নেই, মা অনেকবার চীৎকার চেঁচামেচি করে শেষে ছাড়ান দিয়েছেন কিছুদিনের জন্যে। আজ বেস্পতিবার, দুপুরে সুপ্রতিমের সঙ্গে দেখা করার কথা আছে, পানিহাটির ঘাটে, দুপুরবেলা। সুপ্রতিম ছোটবেলার বন্ধু, এখন সরকারি চাকরি করে। কলকাতায় আসার আগে থেকেই কথা হয়েছিলো। এমনিতে বাড়িতে আজ নিরামিশ রান্না, বাবা সক্কাল সক্কাল ভাত খেয়ে অফিসে, অনুও বেরোবে আর একটু পরেই, তারপরে সারাটা দিন বড্ড বোরিং। ঘরে থাকলে সিগারেট খাওয়া যায় না, পড়ে পড়ে ঘুমনো যায়না, খালি টিভি দেখা, কখনও কোনও বন্ধুর সময় খালি থাকলে তার সঙ্গে দেখা করা আর সন্ধ্যে হলে অনু ফেরার পরে ছাদে গিয়ে আড্ডা। আসলে সব বন্ধুরাই কেমন ব্যাস্ত হয়ে গেছে, কেউ থাকে বিদেশে, কেউ বা তারই মত অনেকদূরে, মাঝে মাঝে বাড়ি এসে জানান দিয়ে যায় বেঁচে আছি মা। খুব খারাপ লাগে কার সঙ্গে দেখা করার কথা ঠিক হয়ে যাওয়ার পরে হয়ত তার ফোন এলো আর বলল, ভাই কিছু মনে করিস না, আজ না হবে না। সে বোঝে না এই একটু মাত্র বেরোনো কেবল দেখা করার জন্যে নয়, এটা তার কাছে সিগারেট খাওয়ার চাবিকাঠি, এটা তার কাছে তার পুরনো শহরকে আরেকবার আরেকটু নতুন করে দেখার সুযোগ।

অর্ণবদাদের বাড়িটা সেই কোনকাল থেকেই লালরঙের, ওরা প্রতিবছর বাড়ির রঙ করাতো, কিন্তু কখনও রঙ বদলায়নি। মোড়ের মাথা থেকে একটা রিকশা নিলো অর্ক, অল্পসল্প সাহেব হয়ে গেছে ও, গরম রোদে হাঁটতে ইচ্ছে করলো না তাই।

কিছু লোকের চেহারা কখনও বদলায়না, সুপ্রতিমেরও সেরকম, সেই আগের মতই সামনের দিকে টুপি বানানো চুল, ঠোঁটের কোণে সবসময় একটা হাসি আর চোখে মুখে বাচ্চাদের সারল্য। মহাপ্রভু ঘাটের পাশের অশ্বত্থ গাছের তলায় বসল দুজন। এখনও ঠাণ্ডা ঠিক করে পড়েনি, কিন্তু দুপুরের পর থেকে সময়টা যখন বিকেলের দিকে গড়ায়, তখন গঙ্গানদীর উপরে কেমন একটা ধোঁয়াশার আস্তরণ পরে। অর্কর ভারি ভালো লাগে এইসময়টা। কেমন একটা শান্ত হয়ে ওঠে চারপাশটা, যেন একটা ছোট্ট বিরতি, তারপরেই আবার গা ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠবে সব কিছু।

কথা বলতে বলতে কখন সময়টা কেটে গেলো, বোঝাই গেলো না, কখন সেই আড্ডার মাঝে তিন কাপ চা উড়ে গেছে, কখন একটা গোটা গোল্ড ফ্লেকের প্যাকেট শেষ হয়ে গেছে, খেয়াল করেনি কেউ। আড্ডার মাঝে ব্যাবসা উঠেছে অনেকবার, চাকরির কথা এসেছে, কখনও বা উঠে এসেছে দীপ্তি। যেমন ভাবে একটা দিনের ছায়া লম্বা হয়, যেভাবে ছোটো ছোটো পা ফেলতে ফেলতে একদিন একটা বাচ্চা হাঁটতে শুরু করে, যেভাবে একটার পর একটা ইট গেঁথে তৈরি হয় বাড়ী, সেভাবে অনেক অনেক ঘটনা, স্মৃতি, আনন্দ ভালবাসা মিশে তৈরি হয় একটা সম্পর্ক, কখনো তাকে আমরা বলি বন্ধুত্ব, কখনো বলি দাম্পত্য, কখনো বলি ভাইবোনের খুনসুটি।

ছাদের উপর বসেছিল ওরা, ওরা মানে অর্ক আর অনু। অনুর অফিস থেকে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে যায়, কখনও রাতও হয়। অর্ক অপেক্ষা করে থাকে এই সময়টার, অনু এলে ওরা ছাদে চলে আসে, তারপর ঘণ্টাখানেক গল্প আর আড্ডা। আচ্ছা দাদা, সুপ্রতিমদা এখন কি করছে রে? অনু জিজ্ঞাসা করল অর্ক কে। এই একটা প্রশ্নের উত্তর এতক্ষন থেকেও ঠিক বুঝতে পারেনি অর্ক, কেমন একটা ভাসা ভাসা উত্তর এসেছে, কখনও কথা শুনে মনে হয়েছে স্কুলের ছেলেমেয়ে পড়ায়, কখনও মনে হয়েছে থিয়েটার করে, কখনও মনে হয়েছে ব্যাবসা। অর্ক খেয়াল করেছিল কাজের কথা বললেই কেমন একটু পাশ কাটাচ্ছিল যেন সুপ্রতিম। ও পুরোটাই খোলসা করে বলল অনু কে, অর্ক দেখেছে, কিছু জিনিসে অনুর মাথা খোলে ভাল।  সব শোনার পরে অনুও ঠিক বুঝতে পারল না।

একটা সময় ছিল যখন ওদের বাড়ির ছাদ থেকে এয়ারপোর্ট এর আলো দেখা যেত। তারপর কত বড় বড় বাড়ী হল, রাস্তায় লোক বাড়ল, দূষণ দখল করে নিলো খোলা আকাশটা। আজকাল মানুষের কথাবার্তাও কেমন যেন পাল্টে গেছে, মানুষ আর আজকাল তর্ক করে না, হয় গুগল দেখে মিটমাট করে নেয়, অথবা একটু কথাবার্তার পরেই সটান জামার কলার ধরে টান দেয়। টানা পঁয়ত্রিশ বছরের বামশাসন শেষে মানুষ একটা কথা বুঝতে শিখেছিল, কোনও কিছুই চিরন্তন নয়। নিচের ঘর থেকে মায়ের গলার আওয়াজ শুনতে পেল অর্ক। নন্তু এসেছে। নন্তু অর্কর পাড়ার বন্ধু। মফস্বলের পাড়া, বন্ধুত্ব ছোটবেলা থেকে হয়। নন্তু ব্যাবসা শুরু করেছে, ছোটো একটা কারখানা খুলেছে মোমবাতি, ধুপ এইসবের।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s