বদলে গেছো তুমি, আমিও…৭

Posted: July 16, 2015 in Bengali, birbhum, Community, life, maoist, nakshal, poverty, Social, Terrorism
Tags: , , , ,

কলকাতা শহরটা এই শেষ দশ বছরে অনেকটা বেড়েছে, উত্তরদিকের বৃদ্ধিটা একটু বেশিই। আগে লোকে ব্যারাকপুরকে কলকাতা ভাবত না, এখন আলাদা ভাবে না, বরানগরকে পর্যন্ত ভাবা হতোনা কলকাতার মধ্যে, এখন ভাবা হয়। যদিও ওটা কর্পোরেশনের এলাকার মধ্যে পড়ে না, কিন্তু তাহলেও আজকাল সেখানে মল হয়েছে, রাস্তা বড় হয়েছে, ফ্লাইওভার আর রাতের আলো দেখে বোঝা মুশকিল একটা সময় ডানলপ ব্রিজের নিচ দিয়ে লোকে যেতে ভয় পেতো, এতটাই ট্রাফিক জ্যাম হত সেখানে। এখন উপর দিয়ে বম্বে রোড গেছে আর নিচে ঝাঁ চকচকে কালো পিচের রাস্তা। একটার পর একটা বড় বড় দোকান আর ইলেকট্রিকাল জিনিসের দোকান। ওই রাস্তা ধরে আরও একটু এগিয়ে গেলে দুধারে চোখে পড়বে ধীরে ধীরে সেই মান্ধাতা আমলের বেশবাস ছেড়ে শহরও বেশ পাল্লা দিয়ে সেজে উঠেছে। হলদে রঙের ট্যাক্সিগুলো আগে বরানগরই আসতে চাইতো না, এখন দিব্যি ব্যারাকপুর অব্দি চলে আসে। দুধারে সদর্পে বেড়ে উঠেছে বহুতল অট্টালিকা আর তার মাঝে ঝুপ করে একটা বহু পুরনো সভ্যতা কেমন যেন হটাৎ করে বড় হয়ে গেছে।

ক্লাস এইটে পড়ার সময় যেমন হটাৎ করে ছোট ছোট ছেলেগুলো লম্বা হয়ে যায় আর তারপরে হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট পরে নেয়, ঠিক তেমন করে শহরটা গায়ে গতরে বেড়েছে, একটু আধটু জেল্লা বাড়িয়েছে সময়ের সাথে সাথে। খড়দা পেরলে একটা সিনেমা হল পড়ত, প্রফুল্ল নামে, সে কবেই বন্ধ হয়ে গেছে, এখন বেশ কিছু মাল্টিপ্লেক্স হয়েছে, সকালে বিকেলে আলাদা আলাদা টিকেট, আলাদা আলাদা সিনেমা, ভেতরে আর বেঞ্চ পেতে দেখতে হয় না, সকালবেলা নীল সিনেমা চলে না, এখন এসি চলে, টিকিটের দাম একটু বেশি ঠিকই কিন্তু কেনার ক্ষমতাও তো অনেক বেড়েছে।

অর্ক আজ শহরে ফিরছে প্রায় দেড় বছর পরে। শহরের ছোঁয়ালাগা শহরতলীর স্কুল পেরিয়ে, সময়ের দাবি মেনে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশুনা করে আজ একটা বেসরকারি জায়গায় কাজ করছে বছর পাঁচেক হল। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, রাস্তা ঘাট, ব্রিজ বানানো তার কাজ, সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে কম্পানির গাড়ীতে চড়ে দশ কিলোমিটার যেতে হয়, তারপর সারাদিন শ্রমিকদের সঙ্গে মাথা খাটিয়ে, শরীরের সব ঘাম ঝরানোর পরে সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফেরা। বাড়ি বলতে কম্পানী যেখানে যেখানে রেখেছে।

মাঝের অনেককটা দিন বাড়ি আসার সুযোগ হচ্ছিলো না, আর তার বাবা মা’ও মাঝে ছোট করে ওর ওখানে ঘুরে গেছিলেন, তাই আর আসার তেমন দরকারও ছিল না। দীপ্তির সঙ্গে সম্পর্কটাও তো টিকলো না, তাই বাড়ি ফেরার তেমন আগ্রহ খুজে পায়নি অর্ক। কিন্তু এই কয়েকটা মাত্র দিনের মধ্যে শহরটাকে এভাবে বদলে যেতে দেখবে, ভাবতে পারেনি ও। প্রচুর আকাশছোঁয়া বাড়ি, শহুরে সিগন্যালের মধ্যে নিজেকে কেমন একটু একা একা মনে হচ্ছিলো। হাওড়া স্টেশনে ট্যাক্সির চীৎকার শুনে একবারও বুঝতে পারেনি এরকম একটা অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে তাকে। বড় বড় বাড়ির মাঝে একটাও খেলার মাঠ দেখতে পেলনা ও, বেশ কিছু নতুন স্কুল দেখতে পেল, কেমন যেন পাঁচিল দিয়ে শুরু আর পাঁচিল দিয়েই শেষ। বাইরে প্রচুর বাস দাঁড়িয়ে। ও যে সরকারি স্কুলে পড়তো, সেখানে বাস ছিল না, কিন্তু ছিল একটা প্রকাণ্ড খেলার মাঠ। চারদিকে গাছ দিয়ে ঘেরা। টিচাররা বেশ একটা গম্ভীর মুখ নিয়ে আসতেন পড়াতে, কখনও মারতেন বেত দিয়ে, কখনও আদর করে গাল টিপে দিতেন। রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে পা ছুঁয়ে প্রনাম করতে হত, বাবা মা শিখিয়েছেন, সবাই অপেক্ষা করতো কখন টিফিন টাইম হবে আর পিংপং বল দিয়ে খেলা হবে পিটটু। দোতলার বারান্দা থেকে উঁচু ক্লাসের দিদিরা তাকিয়ে থাকবে আর হাফপ্যান্ট পরা কচি বয়সের ধেড়ে পাকা ছেলেগুলো ভাববে, তারা কবে বড় হবে। এখনকার এই হলদে রঙের বাস থাকা স্কুলে কি এখনও এইসব হয়? এখনও কি তারা অগ্নি জেল পেন কিনে ভাবে কি দারুন একটা জিনিস! বা নটরাজ পেন্সিলের মাথা চিবিয়ে ভাবে যে দারুন খেতে! ওদের স্কুলে কি চাপকল আছে বা বাহাদুর দারোয়ান? অর্কর একটু ভয় পেল, এমন নয়তো যে স্কুলে ভর্তি হয়ে সময় নিয়ে বড় হওয়ার আগেই এরা বড় হয়ে যায়! সেই হলদে পাতা, লুকিয়ে পড়া বই পড়ার আগেই এরা সবকিছু জেনে ফেলে না তো! বেশিদিন নয়, মাত্র দশ বছর আগেই এরকম একটা স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বোকার মত তাকিয়ে থাকতো ও দীপ্তির দিকে। নিজের ক্লাস শেষ হলেই কোনও একটা অছিলায় বাইরে বেরিয়ে আসতো এই আশায় যে হয়ত দীপ্তিও বেরোবে, কখনও কখনও সেটা মিলেও যেত, আবার কখনও সকাল গড়িয়ে বিকেল হতো, সন্ধ্যে নামত পশ্চিমের আকাশে, কিন্তু দেখা মিলত না। অর্কর আর ভাবতে ইচ্ছে করছিলো না। ঠাকুর কর্নারের পাশের রাস্তা দিয়ে ট্যাক্সিটা ঘুরিয়ে ড্রাইভার মাথা ঘোরালো, জানতে চাইল কোন দিক দিয়ে যেতে হবে…

চলবে…

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s