বদলে গেছো তুমি, আমিও…৬

Posted: July 3, 2015 in Bengali, birbhum, Community, life, maoist, nakshal, Peace, Terrorism
Tags: , , , , ,

এরকম কিছু হলে কি হয়েছে, সেটা বলার দরকার পরে না। এখানে মাঝে মাঝেই পুলিশের ছোবল পড়ে, কখনও সত্যি লোক ধরা পড়ে আর কখনও যেকোনো লোক ধরা পরলেই চলে। রাতেরবেলা দৌড়াদৌড়ির শব্দ শোনা যায়, আর তার একটু পরে গ্রামের লোকের আওয়াজ আর রাস্তায় পড়ে থাকা একটা বা দুটো ডেডবডি। কখনও পুলিশের বডিও পড়ে থাকে, কিন্তু তখন শুরু হয় অত্যাচার, সব কটা ঘর খুঁজে দেখে, খাটের নীচ, গাছের ঝাড়, মড়াই কিছু বাদ থাকে না, কখনও তার মাঝেই এর ওর গায়ে একটু হাত দিয়ে মজা করে নেয় সরকারি কুত্তাগুলো। কিছু বললেই পুরে দেবে সীসার টুকরো আর ঘোষণা করে দেবে মাওবাদী বা দেশদ্রোহী। বিতান পরিস্কার বুঝতে পারলো তার ঘরের দিকেই আসছে আওয়াজটা, সে হাত দিয়ে ইশারা করে চুপ করতে বলল উত্তমকে, তারপর চুপ করে বসে থাকল। একটু পরে দুমদাম দরজায় আওয়াজ হল, সে ঘুম জড়ানো গলায় দরজা খুলে দিলো। তিনটে পুলিশ দাঁড়িয়েছিল বাইরে, একজনকে সে চেনে, আগেও দেখেছে এই গ্রামে, সেই প্রথম মুখ খুলল, উত্তমকে এদিকেই আসতে দেখলাম, তোর ঘরে নেইতো? বিতান বুঝল, সে পার্টি করে বলে এত ভদ্রতা দেখাচ্ছে, আসলে সব কটা শয়তানের গাছ, অন্য লোক হলে এতক্ষনে তার ঘরে ঢুকে নিজেরাই সব খুঁজে উপরন্তু পাশের ঘরে বউদির গায়েও হাত দিয়ে আসতো শালারা। সে মুখে কিছু প্রকাশ করলো না, মুখে বলল, এসেছিল একটু আগেই, জায়গা চেয়েছিল, বলেছিল পিছনে পুলিশ, কিন্তু সে জায়গা না দেওয়ায় বাঁদিকের রাস্তা ধরে দৌড়ে গেছে। এর বেশি আর কিছু জানে না সে। পুলিশগুলো চোখ ছোট ছোট করে এইসব শুনল, তারপরে কথা না বাড়িয়ে হাঁটা দিলো বা দিকের রাস্তা ধরে। বিতান আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো ওদের দিকে তাকিয়ে। বিশ্বাস নেই এই শুয়োরগুলোকে, কখন আবার ফেরত আসে সন্দেহ করে।

সারারাত আর ঘুম হয়নি তার, উত্তম পা ধরে প্রনাম করেছিলো, সে একটা লাথ মেরে বলেছিল, শালা তুই যে নকশাল, সে কথা বলিসনি তো! আমি জানতাম তুই সিপিএম করিস, তারপরে বুঝলাম তোদের পার্টিই বন্ধ হয়ে গেছে বলে এমনি ঘুরে বেরাস আর তুই শালা জঙ্গলের ডাকাত? সকাল হলেই ভাগবি, ভোরের বেলা, আর কেউ যদি দেখে তো ওখানেই একটা গুলি খেয়ে মরে যাস। আর কোনও কথা হয়নি।

সকালবেলা সাহেবের ওখানে যাওয়ার ছিল, মনোহরদা বলে রেখেছিলেন। সকালেবেলাতে আক্রা নদী খুব সুন্দর দেখায়, কেমন একটা তিরতিরে হাওয়া বয় আর বেশ কোমল একটা গন্ধ আসে নাকে। পলাইকে বলা ছিল কাল রাতের বেলা সাহেবকে মেয়ে সাপ্লাই করার কথা। পলাই নিশ্চয় করেছে, ওর কথার দাম আছে। এই গ্রামেও কোথা থেকে মেয়ে যোগাড় করে কে জানে! একবার একটা মেয়ে কে দেখেছিল বিতান, কালো গায়ের রঙ, ভরাট পিছনটা আর বুকের কাছটা, দেখলেই কেমন একটা মোচড় দিয়ে ওঠে বুকটা, মনোহরদা বলেছেন সব ভালো, মেয়েমানুষের পাল্লায় পড়া ভালো না, তাই বিতান একবার দেখেই চোখ সরিয়ে নিয়েছিল, তারপরে একবার আড়চোখে তাকিয়েওছিল, কিন্তু তখন মেয়েটাও ওর দিকে তাকিয়ে সব গোলমাল করে দিলো আর মনোহরদা দেখে ফেলে কটা কাঁচা খিস্তি মারলেন।

সাহেবের বাড়ির গেট খোলা, কাউকে জিজ্ঞাসা না করেই সে ভিতরে ঢুকে গেলো, ইটের রাস্তা পেরিয়ে বাড়িতে ঢোকার মুখেই গলার আওয়াজ শুনতে পেলো মনোহরদা’র। তারপরে দেখতে পেলো দুজনকেই, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। একটু ইতস্তত করে ওখানেই দাঁড়িয়ে গেলো বিতান। বেশ গলা চড়িয়ে কথা বলছিলেন মনোহরদা, সাহেবও মুখেমুখে জবাব দিচ্ছিলেন আধা হিন্দি, আধা ইংরিজিতে, বেশ বুঝতে পারছিলো যে ওদের মধ্যে একটা কিছু নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে। সে বাইরেই অপেক্ষা করতে থাকলো।

এখনও পুরোপুরি বর্ষাকাল আসেনি, বর্ষা এলে এইসব রাস্তায় আর হাঁটা যায় না, অল্পস্বল্প যেসব জমিজমা আছে, তাতেই চাষ আবাদ শুরু হয়ে যায়, আক্রা নদীতে জল বাড়লে রাত জাগে গ্রাম, কখন ঘর ছেড়ে উঠতে হয় স্কুল বাড়িতে! পূবদিকে একটা আমগাছে চোখ গেলো, বাঁজা আমগাছ, ফল নেই একটাও, আমগাছের নীচে একটা বেশ বড় উইপোকার ঢিপি, একটু ভাল করে বৃষ্টি হলেই এইসব ঢুকে যাবে মাটির তলায়। বিতান ভেবে পেলো না যে তখন উইপোকাগুলো বেঁচে থাকবে কি করে? যদিও উইপোকার থাকা বা না থাকার উপরে তার খুব একটা আগ্রহ নেই, তবু কেন মাথায় এল তার? এরকম হচ্ছে আজকাল, কিছু ভাবার আগেই একতাল চিন্তা এসে সব ওলটপালট করে দিচ্ছে। এমনিতেই তার মাথায় বুদ্ধি কম, গ্রামে আছে, ঘরের খাচ্ছে বলে চলে যাচ্ছে, বাইরে বেরোতে হলেই ‘হু হু বাওয়া’ হয়ে যাবে। সে মাঝে মাঝে অবাক হয়, ওদের গ্রামেরই লোক হয়ে মনোহরদা’র এতো কি করে বুদ্ধি! নিজের একটা দোকান আছে মোহম্মদবাজারে, সেটা নাকি বেশ ভালই চলে, বিয়ে করেনি আর এদিকে রাজনীতি করে বেশ নিজেরটা ভাল করে গুছিয়ে নিচ্ছে। আজকাল গ্রামের বয়স্ক লোকেরাও ওর কাছেই আসে শলাপরামর্শ করতে আর মনোহর’দাও বেশ গুছিয়ে জবাব দেন।

এরকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই আমগাছের পিছনের দিকটায় পৌঁছে গেছিলো বিতান। ডানদিকে, যেদিকে কলুখোলার মাঠটা আছে, সেদিকের ডালে একটা পাখির বাসা দেখতে পেলো সে, কোনও আওয়াজ না করে চুপচাপ সেদিকে এগিয়ে গেলো সে আর তক্ষুনি একটা দ্রুম করে শব্দ হল, ছিটকে বেরিয়ে এলো সে, বেশ কিছু পাখি, যারা কোনও গাছের ডালে বসেছিল, উড়ে গেলো আওয়াজ করে। বিতান দৌড়াতে শুরু করলো বাংলোর গেটের দিকে, কিছু একটা ভয়ানক হয়েছে সে বুঝতে পারছিল। সাহেবের ঘরের দিকে তাকাতেই সব পরিষ্কার হল, একটা চেয়ারের উপর উবুড় হয়ে পড়েছিল সাহেব, বলা ভালো সাহেবের ভারিক্কি চেহারাটা, আর অদ্ভুত শান্ত মুখ নিয়ে সামনেই দাঁড়ানো মনোহরদা। কাঠের দরজার একপাশ দিয়ে পাতলা একটা রক্তের ধারা তাজা স্রোত হয়ে বয়ে চলেছে। বিতান চীৎকার করে উঠলো, “মনোহর দা!”

চলবে…

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s