বদলে গেছো তুমি, আমিও…৫

Posted: June 25, 2015 in Bengali, birbhum, Community, maoist, NaBloPoMo, nakshal, poverty, Social
Tags: , , , , , ,

অকল্যান্ড সাহেবের বাংলোর সামনে যখন এলো সে, দেখতে পেল ভেতরে সাহেব একটা হাফ প্যান্ট পরে বসে আছেন চেয়ারে গা এলিয়ে। বিতান অবশ্য একা যায়নি। মনোহরদা’ও ছিলেন ওর সাথে। মনোহরদা কি করতে গিয়েছিল, সেটা অবশ্য ও জানত না, জানার দরকারও ছিল না। ও শুধু গেছিলো মনোহরদা ডাকলেন বলে আর সাহেবের ঘরে একটু উঁকি মারতে। ও জানে যে ওরা খুব গরিব, বড়লোকের বাড়িতে একটু ভালমন্দ খেতে পেলে কি ক্ষতি?

সাহেব ওদের বসতে বললেন। একটু পরে একজন বেয়ারা এসে দুকাপ চা রেখে গেলো। মনোহর দা ওকে বললেন একটু দূরে সরে যেতে, আলাদা ভাবে কথা বলতে চান সাহেবের সাথে, সে আপত্তি করল না। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে বেরিয়ে এলো মনোহর দা, মুখে হাসি নিয়ে। গেটের বাইরে বেরিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে বললেন, “কাজটা হয়ে এলো রে, আরেকটা দিন লাগবে, তারপরে সামনের পঞ্চায়েত ভোটে আমাকে হারায় কে? শোন বিতান, তোকে একটা কাজ করতে হবে, গ্রামে ঢুকবি একটু ঘুরপথ দিয়ে, আমি অন্য রাস্তা দিয়ে যাবো। কাল সক্কাল সক্কাল বেশ কিছু ছেলেপুলে নিয়ে চলে যাবি জমির পাশে, আর শ্লোগান দিতে হবে। বাকি কাজ আমি কাল সকালেই বলে বুঝিয়ে দেবো। যা এখন ভাগ। বিতান দাঁত বের করে একটু হাসল, মনোহরদা ওর হাতে একটা বিড়ি দিলেন, তারপরে মোড়ের মাথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

উত্তরদিকে একটা বড় জামগাছ আছে, সেখানে এইসময়ে জাম পাওয়া যায়। বিতান একবার এদিক ওদিক দেখে নিলো, কাল সকালে যা করার, সেটা হল কিছু ওর মতই বিচ্ছু ছেলে জুটিয়ে সকালে চলে যেতে হবে ওই জমির কাছে আর চিৎকার করতে হবে যে গ্রামের জমি ছাড়বো না, পুঁজিবাদীর কালোহাত ভেঙ্গে দাও, গুড়িয়ে দাও, তারপরে মনোহরদা যাবেন ওদের তরফে কথা বলতে অকল্যান্ড সাহেবের সাথে, কিছু শর্ত দেবে আর অকল্যান্ড সাহেব সেটা মানবেন না, আবার সবাই চিৎকার করবে, তারপরে অকল্যান্ড সাহেব মেনে নেবেন অল্প কিছু দাবি র মনোহরদা আকর্ণ হাসি হেসে দেশ জয়ের কাজ সমাধা করবেন। এটা ও অনেকদিন ধরেই জানে। এর আগে একবার ইলেকট্রিক আসার কথা হয়েছিল সরকারের তরফে, সেখানেও এভাবেই কথা বলে কায়দা করে হিরো হয়ে গেছিলো মনোহরদা। সামনের ভোটে দাঁড়াবে এইবার, এখন থেকেই তার জমি তৈরি করছে। গ্রামের লোকও বোকা, ওই বাঁজা জমিতে চাষ আবাদ কিছুই হয় না, ফি বছর একবার করে মাটি খুঁড়ে পুকুর বানানোর খেলা করা হয়, সেখানে কারখানা হলে ক্ষতি কি, কেউ জানে না। পাবলিক বহুত বোকা, যে যেমন খাওয়ায়, সে তেমনই খায় আর এখান থেকেই বিতানকেও করে খেতে হবে। দাদার সঙ্গে জোত দেওয়ার কাজ তার পোষাবে না একেবারে। ভাবতে ভাবতে জামগাছের নিচে পৌঁছে গেলো সে, আর কপাল ভালো, হাতের কাছেই বেশ কটা পাকা পাকা জাম পেয়ে গেলো। কটা বউদির জন্যে পকেটে পুরে নিলো। ওর বউদিটা কেমন একটা হয়ে গেছে, তবে কেউ কিছু এনে দিলে বড় খুশি হয়। বাকি জামগুলো খেতে খেতে তাঁতিপাড়ার রাস্তা টা ধরল। এই রাস্তায় সন্ধ্যের পরে কেউ খুব একটা বেরোয় না।

সকালে যেমনটা ভাবা হয়েছিল, তেমনটাই হল, মজা দেখতে না ভয়ের জন্যে বেশ ভালোই ভিড় হয়েছিল। অকল্যান্ড সাহেব হাত পা নেড়ে অনেক কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন আর এদিকে মনোহরদা কিছুই শুনবেন না! শেষে অকল্যান্ড সাহেব অর্ধেকের বেশি কথা মেনে নিলেন, কথা দিলেন বাইরে থেকে নয়, বেশীরভাগ শ্রমিকই গ্রাম থেকে নেওয়া হবে, বটতলার মন্দির টা তৈরি করে দেওয়া হবে পাকা করে, রাস্তা গ্রামের মধ্যিখান দিয়ে নয়, পাশ দিয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। দুপুরে এলো প্যাকেট করা বিরিয়ানি আর বিকেলে এলো প্যাকেট করা মাল,মাল মানে চোলাই। বেড়ে নেশা হয়। দু’প্যাকেট টানার পর সত্যি মালুম হয় কেন বলা হয় রাজনীতি হল রাজার নীতি!

ঘুমটা সবে চোখে লেগেছে, আর সেই সময়েই উত্তমদা’র গলা পেলো বিতান, নিচুগলায় ডাকছিল দরজার বাইরে থেকে, উত্তমদা অন্য দলের লোক কিন্তু একই গ্রামে থাকে, ছোটবেলায় একসাথে অনেক ফুটবল খেলেছে সে, মনোহরদা বারবার বলে দিয়েছেন অন্য লোকের ডাকে রাতের বেলা দরজা না খুলতে কিন্তু তাই বলে উত্তমকে অন্য দলের লোক ভাবতে তার ইচ্ছে করলো না। একা উত্তমই দাঁড়িয়ে ছিল, বারবার পিছনে ফিরে দেখছিল আর কেমন একটা কাপছিল ও, তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকিয়ে নিলো বিতান, তারপরে দরজা টা বন্ধ করে হুড়কো টেনে দিলো।

চলবে…

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s